হুমায়ূন কবীর ঢালী
“আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।”
- সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে/ হুমায়ুন আজাদ
হুমায়ুন আজাদ বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় ও প্রাতঃস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, প্রাবন্ধিক এবং নির্ভীক এক সমাজচিন্তক। তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা, অকুতোভয় লেখনী এবং প্রথাবিরোধী চিন্তাধারা বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির মননশীলতাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। সমাজের বদ্ধমূল ধারণা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন লড়েছেন তাঁর কলম দিয়ে।
তাঁর সৃষ্টিকর্মের পরিধি ছিল বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। সেটি হোক কবিতায়, হোক ভাষাবিজ্ঞানে কিংবা উপন্যাসে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর গবেষণাধর্মী কাজ যেমন আমাদের ভাষাচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি তাঁর শাণিত প্রবন্ধগুলো পাঠকদের ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে এবং প্রচলিত ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। হুমায়ুন আজাদ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে— অলৌকিক ইস্টিমার (তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ), জ্বলো চিতাবাঘ, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, যতোই গভীরে যাই ততোই আকাশ এবং উপন্যাসগুলো— ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, সব কিছু ভেঙে পড়ে, রাজনীতিবিদগণ ও পাক সার জমিন সাদ বাদ।
প্রবন্ধ ও গবেষণার ক্ষেত্রে ‘নারী’ অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত গ্রন্থ। সিমোন দ্য বোভোয়ারের ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর রূপান্তর ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ও বেশ জনপ্রিয় ও আলোচিত।
‘আমার অবিশ্বাস’ তাঁর ভাবনা ও দর্শনকে তুলে ধরে। এছাড়া একজন ভাষা বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে, ‘বাঙলা ভাষা’ (দুই খণ্ড), ‘তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান’, ‘বাক্যতত্ত্ব’ গ্রন্থে।
কিশোর সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; আগামী প্রজন্মের জন্য তিনি রেখে গেছেন বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিধর্মী চিন্তার এক বিশাল ভাণ্ডার। কিশোর সাহিত্যের বইয়ের মধ্যে— লাল নীল দীপাবলি (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে লেখা), ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, কত নদী সরোবর, আব্বুকে মনে পড়ে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা আজও পাঠকদের সমানভাবে আলোড়িত করে।
২৮ এপ্রিল এই মহান লেখকের জন্মবার্ষিকী। একজন প্রকৃত লেখকের কখনও মৃত্যু নেই; শারীরিক অনুপস্থিতি থাকলেও তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মাঝে, পাঠকের হৃদয়ে। বাঙালির বৌদ্ধিক বিকাশে এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চায় হুমায়ুন আজাদের মতো বহুমাত্রিক প্রতিভা ও আপসহীন কণ্ঠস্বর আমাদের চেতনায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি প্রথাবিরোধী এই কলম যোদ্ধাকে।
