যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশীল সমাজ হলো জাতির বিবেক ও আলোকবর্তিকা। দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনসচেতনতা তৈরি করাই তাদের মূল কাজ। কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এদেশের সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে ক্ষমতার সুবিধাভোগী হতে ব্যস্ত থাকে, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিরাজনীতিকরণে বিশ্বাসী সুশীলরা ২০০৭ সালের এক-এগারো এবং ২০২৪ সালে জনগণের রায় ছাড়াই রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশীদার হন। তবে উভয় ক্ষেত্রেই তারা দেশ পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিরাই আজ সরকারের বিদায়ের পর সুর পাল্টে কঠোর সমালোচনা করছেন।
সম্প্রতি সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অসম চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ঝুঁকি। অথচ এই ড. দেবপ্রিয় ইউনূস সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করার সময় অর্থনীতির বিপর্যয়ের কোনো তথ্য জনসমক্ষে আনেননি। যখন হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হচ্ছিল এবং বেকারত্ব বাড়ছিল, তখন তিনি সরকারের ‘সাফল্যের’ গুণগান গেয়েছেন।
একইভাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময় তিনি যতটা সোচ্চার, ইউনূস সরকারের দেড় বছরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিনা বিচারে আটকের ঘটনায় তিনি ছিলেন রহস্যজনকভাবে নীরব। মানবাধিকার কমিশন দীর্ঘদিন গঠন না হওয়া কিংবা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তথ্যপ্রমাণ ছাড়া ‘অর্থ পাচারকারী’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করার সময় টিআইবি টুঁ শব্দটি করেনি। অথচ আজ সরকারের বিদায়ের পর তিনি দুর্নীতির তদন্তের দাবি তুলছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) ড. বদিউল আলম মজুমদারও এই ‘সংস্কার নাটকের’ অন্যতম কুশীলব ছিলেন। সংবিধান নিয়ে গভীর পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির অবৈধ সংবিধান সংশোধন আদেশ জারির সময় তিনি নীরব থেকেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, পূর্ববর্তী সরকারের সমর্থকদের যদি ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করে জেল বা নির্বাসনে পাঠানো হয়, তবে ইউনূস সরকারের অপশাসনের দায়ভার এই সুশীলরা কেন নেবেন না? তাদের কেন ‘দোসর’ বলা হবে না?
তবে এই আঁধারেও শাহদীন মালিকের মতো কিছু সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতো ব্যক্তিরা জাতির বিবেকের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের অনিয়ম ও অপশাসনের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠে কথা বলেছেন। সচেতন মহলের মতে, দেশ এখন অনুগত ও স্তাবক সুশীলদের পরিবর্তে এমন আলোকিত মানুষদের চায়, যারা ক্ষমতার লোভে সত্যকে বিকিয়ে দেবেন না।
অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার
