রাশেদা কে. চৌধূরী
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সবচেয়ে কলঙ্কজনক এবং দুঃখজনক অধ্যায় ছিল শিক্ষকদের মর্যাদাহানি ও মব সংস্কৃতির বিস্তার। ওই সময় কে বা কারা মব তৈরি করেছে, তা সরকার শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বহু শিক্ষক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছেন। একটি সভ্য রাষ্ট্রে কাউকে পছন্দ না হলেই টেনে নামানোর এই সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, যা ভবিষ্যতে আর কখনোই কাম্য নয়।
শিক্ষকদের প্রতি এই অমানবিক আচরণের ফলে একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও মর্যাদা রক্ষায় বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে এবং ১২ দফা সংস্কার এজেন্ডার মধ্যেও শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। মবের শিকার হওয়া শিক্ষকদের সংখ্যা অনেক। তাঁদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা বর্তমান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব।
অনেক শিক্ষক এখনো ভয়ে কর্মস্থলে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। অথচ একজন শিক্ষককে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। এখন যদি স্থানীয় সিস্টেম, কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো প্রভাবশালী নেতাকর্মী শিক্ষকদের যোগদানে বাধা সৃষ্টি করে, তবে সেটা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। সরকারের আশ্বাস সত্ত্বেও যেসব জায়গায় শিক্ষকরা যোগদান করতে পারছেন না, সেসব স্থান চিহ্নিত করে সরকারকেই কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
প্রয়োজনে তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে—কারা শিক্ষকদের যোগদানে বাধা দিচ্ছে। এসব শিক্ষককে কর্মস্থলে ফিরতে না দেওয়া মানেই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। আমরা বারবার বলেছি, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনেই বিচার করা সম্ভব ছিল, কিন্তু মব সংস্কৃতি বা জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো কোনোভাবেই আইনি পথ হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে ব্যর্থ হলেও এখন নির্বাচিত সরকার এসেছে, তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষক সমাজের।
এই সংকট নিরসনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর একটি ডাটাবেইস তৈরি করতে পারে। যারা এখনো যোগদান করতে পারেননি, তাদের জন্য আবেদন আহ্বান করা যেতে পারে এবং তাদের আবেদনের ভিত্তিতে অধিদপ্তর থেকে সরাসরি যোগদানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা অফিসাররা রয়েছেন, তাঁদের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা কঠিন কোনো কাজ নয়। আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর দ্রুত এই দায়িত্বশীল কাজটি সম্পন্ন করবে।
লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান
