নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ ‘সচিব’ নিয়ে পর্দার অন্তরালে শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষমতার লড়াই ও নজিরবিহীন রটনা। নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসন (অ্যাডমিন) ক্যাডার বনাম সাবেক ইকোনমিক ক্যাডারের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দ্বন্দ্ব। আর এই প্রশাসনিক স্নায়ুযুদ্ধে এবার মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তী নতুন মেয়াদের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী। দুই মন্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দের জাঁতাকলে পড়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পরও নতুন সচিব তাঁর পদে যোগ দিতে পারছেন না। ফলে গত প্রায় দেড় মাস ধরে সম্পূর্ণ সচিববিহীন অবস্থায় স্থবির হয়ে পড়ে আছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান কর্মকর্তার পদটি শূন্য থাকার কারণে দৈনন্দিন রটিন কাজের বাইরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ কাজকর্ম ও দাপ্তরিক ফাইলে চলছে চরম ঢিলেঢালা ভাব। উল্লেখ্য, গত ১৭ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব মাহবুবুর রহমান ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকেই পদটি শূন্য হলে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান রুটিন দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
যোগদানপত্র নিলেন না বাণিজ্যমন্ত্রী!
মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন সূত্রের খবর, ঈদের ঠিক আগে গত ২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আতাউর রহমান খানকে পদোন্নতি দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ঈদের ছুটির পর প্রথম কার্যদিবস সোমবার সকালে নবনিযুক্ত সচিব তাঁর নতুন দপ্তরে আসেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি সচিবালয়ের চারতলায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দপ্তরে গিয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক যোগদানপত্র দাখিল করেন। তবে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার অবতারণা ঘটিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর সেই যোগদানপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
মন্ত্রীর দপ্তর থেকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাখানের পর নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব আতাউর রহমান খান আর তাঁর নির্ধারিত সচিবের চেয়ারে বসেননি। এরপর থেকে সচিবের কক্ষটি সম্পূর্ণ শূন্য রয়েছে। তবে পর্দার অন্তরালে ক্ষমতার অক্ষ বদলের লড়াই চলছে পুরোদমে। গত মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম গতিশীল করতে দুপুর ১২টায় একটি জরুরি সমন্বয় সভার আহ্বান করা হলেও, মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জরুরি তলবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ায় সভাটি প্রায় ঘণ্টাখানেক বিলম্বে শুরু হয়।
নেপথ্যে অ্যাডমিন বনাম ইকোনমিক ক্যাডারের ব্যাচ দ্বন্দ্ব
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাণিজ্য সচিবের এই নিয়োগ ও যোগদান সংক্রান্ত জটিলতার মূল বীজ লুকিয়ে আছে অ্যাডমিন ক্যাডারের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে। বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান হলেন বিসিএস ১৫তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের একজন অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) কর্মকর্তা।
অপরদিকে, বাণিজ্য সচিব হিসেবে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতাউর রহমান খান হলেন ১৮তম ব্যাচের সাবেক ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, বিগত ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন সরকার বিসিএস (ইকোনমিক) ক্যাডার বিলুপ্ত করে একে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত করে গেজেট প্রকাশ করেছিল। এর ফলে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রশাসন ক্যাডারের অংশ হিসেবে জ্যেষ্ঠতা লাভ করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নতুন সচিব আতাউর রহমান খান (১৮তম ব্যাচ) ইকোনমিক ক্যাডার একীভূতকরণের সূত্রে পদোন্নতি পেলেও তিনি ওই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খানের (১৫তম ব্যাচ) চেয়ে তিন ব্যাচের জুনিয়র। ফলে প্রশাসন ক্যাডারের একজন মাঠপর্যায়ের সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে সাবেক ইকোনমিক ক্যাডারের একজন অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাকে সচিব হিসেবে বসানোর বিষয়টি মানতে পারছেন না পিওর অ্যাডমিন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাঁরা দলবেঁধে বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের কাছে জোর তদ্বির করেন এবং মন্ত্রীকে দিয়ে যোগদানপত্র আটকে দেন।
মুখোমুখি দুই মন্ত্রী: ঝুলে আছে ভাগ্য
এদিকে জ্যেষ্ঠতার মারপ্যাঁচে পড়ে বাণিজ্য সচিবের পদে যোগ দিতে না পেরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিয়ে আতাউর রহমান খান দ্বারস্থ হন তাঁর পূর্বতন কর্মস্থল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে। এই যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জনপ্রশাসনের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে কথা বলেন।
প্রশাসনিক এই জটিলতা নিরসনে দুই মন্ত্রীর মধ্যে দফায় দফায় আলাপ-আলোচনা ও দেনদরবার চললেও এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট রফাদফা হয়নি। ফলে দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর রাজনৈতিক ও ক্যাডারভিত্তিক দ্বৈরথের মাঝখানে ঝুলে গেছে পদোন্নতি পাওয়া নতুন সচিবের ভাগ্য। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের বাণিজ্য খাতকে, যা অভিভাবকহীন অবস্থায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
