নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজনীতিতে ভোলবদল আর দ্বিচারিতার এক চরম নজির স্থাপন করলেন বর্তমান বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ভোট পেতে যিনি আদালত ও নির্বাচনী ময়দানে ‘আদর্শিক রাজনীতি’ আর ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না করার’ পক্ষে বীরত্বগাথা শুনিয়েছিলেন। সেই আসাদুজ্জামানের বিএনপি সরকার গতকাল বুধবার (৮ এপ্রিল) সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিল পাসের মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঝিনাইদহ-১ আসনের নির্বাচনী প্রচারণায়। অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে যখন তিনি মাঠে নামেন। তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের ভোট ও সমর্থন পেতে এক অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেন আসাদুজ্জামান।
সে সময় তিনি গর্বভরে প্রচার করেন যে, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের রিট করা হয়েছিল। তখন তিনিই আদালতে এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রচারণায় তিনি বলেছিলেন,
“আমি আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, যারা এই পিটিশন নিয়ে এসেছেন, তাদের অধিকার নেই একটি আদর্শকে হত্যা করার। আওয়ামী লীগে যেমন খুনি আছে, তেমনি সেখানে আদর্শিক সৈনিকও আছে। আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সেদিন আমি আওয়ামী লীগের রেজিস্ট্রেশন বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাধা দিয়েছিলাম।”
তিনি আরও দাবি করেছিলেন যে, কোনো আদর্শকে হত্যা করে তিনি রাজনীতি করতে চান না। মূলত আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকদের আশ্বস্ত করে তাদের ভোট ব্যাংক নিজের দিকে টানতেই তিনি এই ‘বীরত্ব’ দেখিয়েছিলেন বলে এখন প্রমাণিত।
দেশের একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ ও প্রগতিশীল চেতনার নাগরিকরা যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি সহানুভূতিশীল বা সরাসরি সমর্থক। তাদের সাথে এই বিএনপির সরকার চরম প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হযনি। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেই সরকার এখন যুদ্ধাপরাধী রাজাকার জামায়াতে ইসলামীর সাথে মিলেমিশে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারি দল অওয়ামী লীগকে তাদেরই রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার পথে হাঁটল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বিএনপি সরকার আসলে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতে ইসলামীর মন রক্ষা করতেই এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জামায়াতের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে দেশ চালানোর শর্ত হিসেবেই কি তবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলো? যে জামায়াত এক সময় নিষিদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল, আজ তাদের তুষ্ট করতেই ৫২ শতাংশ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।
আইন পাসের পর থেকেই আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সেই নির্বাচনী বক্তব্যের ভিডিও এখন ইন্টারনেটে ভাইরাল। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা সেই ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, সেদিন যারা আমাদের ভোট পেতে আদর্শের বুলি আউড়েছিলেন, আজ তারাই আমাদের পরিচয় কেড়ে নিলেন।
একজন আইনজীবীর এমন দ্বিমুখী অবস্থান একদিকে আদালতে নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর অন্যদিকে আইনমন্ত্রী হিসেবে সেই একই দলকে নিষিদ্ধের বিল সংসদে সমর্থন দেওয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দ্বিচারিতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই প্রতারণার ফল দেশের প্রগতিশীল সমাজ ও বিশাল জনসমষ্টি কীভাবে নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
