নিজস্ব প্রতিনিধি
ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর সমান্তরালে দাঁড়িয়ে আজ বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে যে রাজনৈতিক দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান, ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিলে এসে সেই একই দল—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিল পাস হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে। তফাৎ শুধু এটুকুই, তখন নিষিদ্ধকারী ছিল বিদেশি দখলদার বাহিনী। আর আজ সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে দেশীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ইয়াইয়া হয়ত বুঝেছিলো ৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় থেকে শুরু করে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৭০ এর নির্বাচন বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ ৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে স্বাধীন করে জনগণের নায্য অধিকার, স্বাধীনতা বুঝে নেবে। ঠিক তেমনি হয়ত স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাকারি জামায়াত ও ইন্টারপাশ তারেক রহমানের সরকার হয়ত বুঝতে পেরেছে ২৪ সালের জুরাই আন্দোলনের নামে জঙ্গি হামলার শিকার, ধ্বংসের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দেশটাকে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর কন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাীনতা ও সার্বভৈৗমত্ব ফিরে পাবে সেই ভয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ ও দলের বিচারের দাবি করছেন।
একাত্তরের সেই কালো দিন: ইয়াহিয়ার হুঙ্কার
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান রেডিওতে দেওয়া এক ভাষণে ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর প্রতিবেদনে সেই সংবাদটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল “পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন ঘোষণা শেখ মুজিবুরের, প্রচণ্ড লড়াই”।
সেদিন ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে ভর্ৎসনা করেছিলেন এবং ঘোষণা দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের পবিত্র মাটি থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নিষিদ্ধ করার মাত্র নয় মাস পরেই সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
২০২৬: আইনি মোড়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা
দীর্ঘ ৫৫ বছর পর আবারও সেই একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটল। বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ‘ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ’ এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে দেখছেন। একাত্তরে ইয়াহিয়া যে কাজটি বন্দুকের নলে করতে চেয়েছিলেন, বর্তমান সরকার তা করল একপাক্ষিক সংসদের রাবার স্ট্যাম্প ব্যবহার করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘আমিই আওয়ামী লীগ’ ক্যাম্পেইন
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার এই আইনি আদেশের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকরা ঘরে বসে নেই। ফেসবুক, এক্স (টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রামে শুরু হয়েছে এক বিশাল গণজাগরণ। নেটিজেনরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন “আমিই আওয়ামী লীগ” ক্যাম্পেইন।
হাজার হাজার ব্যবহারকারী তাদের প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে এবং দলীয় স্লোগান পোস্ট করে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে “ইউ ডোন্ট কেয়ার” (You Don’t Care) স্লোগানটি। তারা বোঝাতে চাচ্ছেন, কাগজে-কলমে দল নিষিদ্ধ করলেও মানুষের হৃদয়ে থাকা আদর্শকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা কি নেওয়া হলো না?
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এই নিষিদ্ধের আদেশের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ইয়াহিয়া খানও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সফল হননি। বর্তমান সরকারও ইতিহাসের সেই আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবে। তাদের দাবি, একটি ঐতিহ্যবাহী দল যাঁর হাতে দেশের স্বাধীনতা এসেছে, তাকে নিষিদ্ধ করা মানে খোদ রাষ্ট্র ও স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করা।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। একাত্তরের সেই নিষেধাজ্ঞার পরিণতি যদি স্বাধীনতা হয়ে থাকে, তবে ২০২৬-এর এই নিষেধাজ্ঞার পরিণতি কোন গণজাগরণ বয়ে আনে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
