নিজস্ব প্রতিনিধি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২০ মাসে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় জমেছে। দলটির দাবি, এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই সংখ্যাকে ‘ভিত্তিহীন ও প্রপাগান্ডা’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দাবি করেছেন, তাদের প্রায় ৫ লাখের ওপর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই রয়েছে সাড়ে ৬০০-র বেশি মামলা।
বাহাউদ্দিন নাছিম বিদেশ থেকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের ১০ হাজারের মতো নেতাকর্মীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। দুই থেকে আড়াই হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে অভিযোগ করার সাহস পাচ্ছেন না, তাই পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই।
একই সুর শোনা গেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শেখ জামাল হোসাইনের কণ্ঠে। তিনি দাবি করেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ৪ লাখের বেশি নেতাকর্মী কারাবরণ করেছেন এবং প্রায় ১০ হাজার জন এখনো নিখোঁজ।
সংসদীয় রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেগুলোকে ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করেছে।
বিপরীতে, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ২০ মাসেই তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা আগের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ৮ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ কাউকেই এই আইনি বেড়াজাল থেকে বাদ দেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ মাসে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৬ জন নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থাকা ৪৫ জন আওয়ামী সমর্থক রয়েছেন। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হলেও আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী সংখ্যার সাথে সরকারি ভাষ্যের বড় ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ‘লক্ষাধিক’ মামলার দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কিছু মামলা হয়েছে। তবে লাখ লাখ মামলা হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন।
এদিকে সংসদীয় বিলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে ‘বেআইনি ও অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দলটির নেতারা। তাদের মতে, এটি ইউনুস সরকারের প্রতিহিংসাপরায়ণ নীতির বহিঃপ্রকাশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মামলার এই বিশাল পরিসংখ্যান এবং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে আওয়ামী লীগ একে ‘গণ-নিপীড়ন’ বলছে, অন্যদিকে সরকার একে ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’র অংশ হিসেবে দাবি করছে। সত্য যাই হোক, ২০ মাসের এই আইনি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় হয়ে থাকবে।
