নিজস্ব প্রতিনিধি
সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্য দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জুলাই আন্দোলনে নিহত পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুকে ‘যুদ্ধের ময়দানে ফয়সালা’ বলে অভিহিত করে তিনি যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তা কেবল পেশাদার বাহিনীর মনোবলই ভাঙেনি, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধকেও এক বিতর্কিত সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, পুলিশ হত্যার বিচার চাইলে মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করতে হবে। তার এই মন্তব্যকে সচেতন মহল ‘কুরুচিপূর্ণ’ এবং ‘ইতিহাস বিকৃতি’ হিসেবে দেখছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাষ্ট্র গঠনের সশস্ত্র সংগ্রাম। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল কথিত স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের মোড়কে মেটিকুলাস ডিজাইনে ডিপস্টেট এর খেলা।
মন্ত্রী হয়তো ভুলে গেছেন, ১৯৭১ সালে এই পুলিশ বাহিনীই রাজারবাগ থেকে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সেই গর্বিত বাহিনীকে ‘হানাদার বাহিনী’র সাথে তুলনা করা এবং তাদের মৃত্যুতে বিচারের পথ বন্ধ করা পক্ষান্তরে মুক্তিযুদ্ধকেই খাটো করার সামিল।

সংসদে সরকার এবং বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন অনড় অবস্থানের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গুঞ্জন রয়েছে, পুলিশ হত্যার বিচার শুরু করলে জামায়াত-এনসিপিসহ সমমনা দলগুলো সংসদ ত্যাগ করতে পারে। সংসদকে ‘সচল’ দেখাতে সরকার হয়তো এই আপসকামিতার পথ বেছে নিয়েছে।
সংসদের ভেতর সরকারি দল ও বিরোধী দলের এই অবস্থানকে সাধারণ মানুষ ‘একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ হিসেবে দেখছে। পর্দার আড়ালে দীর্ঘদিনের সখ্যতা আর সামনে বিরোধিতার অভিনয়—এই তত্ত্বে এখন জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হলো তার পুলিশ বাহিনী। আন্দোলনের সময় প্রায় ৩৫ শতাধিক সদস্যের প্রাণহানি ঘটার পরও যদি সরকার ‘সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ দিয়ে বিচারের পথ রুদ্ধ করে, তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। সহকর্মীদের হত্যার বিচার না পাওয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম হাতাশা ও অনিরাপত্তা তৈরি করেছে। বিচারের বদলে ‘রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি’র তকমা পুলিশকে জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একদিকে পুলিশকে আধুনিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পন্ন করার কথা বলছেন, অন্যদিকে তাদের হত্যাকাণ্ডের বিচারকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। এটি একটি চরম দ্বিমুখী নীতি। ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর বিচারের কথা বলে নিজেরা যদি আরেকটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে, তবে তা কথিত জুলাই যোদ্ধাদের কথিত ত্যাগের প্রতিও চরম অসম্মান।
