❝ আরে যে কোনো যুদ্ধে ধর্ষণ তো হয়ই!❞ – যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন সংক্রান্ত কথা উঠলেই একশ্রেণীর লোক এই টাইপ মন্তব্য করে কথা এড়িয়ে যায়। যেন এটা স্বাভাবিক, যেন এটা ঘটনার অনিবার্য অংশ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যা হয়েছিল সেটা এই “যুদ্ধে ধর্ষণ হয়” ব্যাখ্যার ভেতরে ঢুকবে না। কারণ এটা উত্তেজনায় করা অপরাধ ছিল না। এটা ছিল নীতি। পরিকল্পনা। কমান্ডের সিদ্ধান্ত।
আন্তর্জাতিক জার্নাল নিউ পলিটিক্যাল সায়েন্সে ২০০০ সালে প্রকাশিত লিসা শারল্যাসের গবেষণা “Rape as Genocide: Bangladesh, the Former Yugoslavia, and Rwanda” দেখিয়েছে বাংলাদেশে ধর্ষণ কীভাবে গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে পদ্ধতিগতভাবে ব্যবহার হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নারীদের আটকে রাখা হতো সপ্তাহের পর সপ্তাহ। মাসের পর মাস। তারপর হত্যা। এটা যুদ্ধের ক্রোধ না। এটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পরিচালিত নীতি। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি নারীকে সন্তান ধারণ করানো। পাকিস্তানি সৈন্যের সন্তান। এভাবে বাঙালি জাতির রক্তকে বদলে দেওয়া। এটা গণহত্যার একটা বিশেষ ধরন, যেটাকে শারল্যাস সরাসরি “reproductive violence” বলেছেন।
জেনারেল নিয়াজি হামুদুর রহমান কমিশনে বলেছিলেন সৈন্যদের ঠেকানো যায়নি। এই কথাটা মিথ্যা। সেনাবাহিনীতে সর্বোচ্চ কমান্ডার নির্দেশ দিলে সৈন্য থামে। নির্দেশ দেওয়া হয়নি কারণ থামানো কখনো উদ্দেশ্য ছিল না। লে.জে. টিক্কা খান “Butcher of Bengal” উপাধি পেয়েছিলেন কারণ তিনি চেয়েছিলেন এই অত্যাচার হোক। এটা আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা না। এটা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে দুই লাখ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। মার্কিন কূটনৈতিক সূত্রে দুই থেকে চার লাখ। এই সংখ্যাগুলো যারা সামনে এসেছেন তাদের হিসাব। কিন্তু বেশিরভাগ আসেননি। লজ্জায়, ভয়ে, পারিবারিক চাপে চুপ ছিলেন। তাদের ধরে নিলে কত হয়? কেউ বলতে পারবে না।
যুদ্ধের পরে পরিবার অনেক নারীকে নেয়নি। পরিত্যাগ করেছে। “অপবিত্র” হয়ে গেছেন। এটা শুনলে ক্রোধ জাগে, কিন্তু এটাই সত্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যা করেছে তার শাস্তি ভোগ করেছেন ভুক্তভোগী নারীরাই, অপরাধীরা না। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু সমাজ সেই স্বীকৃতি মানেনি। অনেক নারী বীরাঙ্গনা পরিচয়ই নেননি কারণ সেই পরিচয় নিলে প্রশ্ন আসবে।
যুদ্ধশিশুদের কথাও এই প্রসঙ্গে বলা দরকার। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের বঙ্গবন্ধু সরকার দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল বিদেশে। কিছু শিশু গিয়েছিল কানাডায়, ইউরোপে। কিছু শিশু থেকে গিয়েছিল, পরিচয়হীন, ইতিহাসের পাদটীকায় একটা ছোট্ট অনুচ্ছেদ হয়ে।
এই পুরো কলঙ্কজনক অধ্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথা না বললে অসম্পূর্ণ থাকে। তারা বলেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানে ইসলামের পতন। হিন্দু মানে দেশের শত্রু। বাঙালি মানে ভারতের দালাল। এই মতাদর্শ পাকিস্তানি সৈন্যের মাথায় ঢুকিয়ে দিলে বাঙালি নারীকে নির্যাতন করা তার কাছে ধর্মের কাজ মনে হয়। এই মতাদর্শ তৈরি না হলে দুই থেকে চার লাখ নারী নির্যাতনের সংখ্যা সম্ভব ছিল না। জামায়াতে ইসলামী শুধু রাজাকার বাহিনী তৈরি করেনি। তারা একটা মানসিকতা তৈরি করেছিল যে বাঙালিদের নিপীড়ন করা পাপ না।
এই মানসিকতার বিরুদ্ধে একটাই জবাব সম্ভব। সত্যটা বলা। বারবার বলা। কখনো থেমে না গিয়ে।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপুঞ্জি :
১) Lisa Sharlach, Rape as Genocide: Bangladesh, the Former Yugoslavia, and Rwanda, New Political Science, Vol. 22, No. 1, 2000
২) Tazreena Sajjad, The Post-Genocidal Period and its Impact on Women, in Samuel Totten (ed.), Plight and Fate of Women During and Following Genocide, Transaction Publishers, 2012
৩) Blood Telegram, Archer Blood, US Consul General Dhaka, March–April 1971, declassified 2002, National Security Archive, George Washington University
৪) US Senate Committee on Foreign Relations, Report of Senator Edward Kennedy, 1 November 1971
৫) Hamoodur Rahman Commission Report, leaked 2000
৬) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, খণ্ড ৩, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার, ১৯৮২
৭) ICT Bangladesh রায়সমূহ, ict-bd.org
৮) In The World: Why is the mass sexualized violence of Bangladesh’s Liberation War being ignored?, 25 March 2016। Bangladesh Genocide Archive, genocidebangladesh.org
