নিজস্ব প্রতিনিধি
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করছে। সাত শ’র বেশি আক্রান্ত আর ৫০-এর অধিক শিশুর প্রাণহানি। পরিসংখ্যান যখন শিউরে ওঠার মতো, তখন স্বাস্থ্য প্রশাসনের এক অবিশ্বাস্য গাফিলতি সামনে এসেছে। ক্যাম্পেইন করার মতো দুই কোটি হামের টিকা দেশে থাকলেও স্রেফ ‘সিরিঞ্জ নেই’ এবং দাতা সংস্থা ‘গ্যাভি’র ফান্ডের অপেক্ষায় আগামী দুই মাস টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের এই অদক্ষতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে স্রেফ ‘গাফিলতি’ নয়, বরং ‘জনস্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবহেলা’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
সম্প্রসারণিত টিকাদান কর্মসূচি কার্যালয়ের তথ্যমতে, হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা দেশে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সেই টিকা শরীরে পুশ করার জন্য প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ নেই।
ইপিআই-এর উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানিয়েছেন, সিরিঞ্জ ও আনুষঙ্গিক লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য তারা বৈশ্বিক জোট ‘গ্যাভি’র আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সেই টাকা এখনো হাতে না আসায় মে, জুন ও জুলাই মাস জুড়ে ধাপে ধাপে সিরিঞ্জ কেনা হবে।
অর্থাৎ, জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার বদলে সরকার এখন দাতা সংস্থার দয়ার ওপর নির্ভর করে শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কিছু হঠকারী সিদ্ধান্তই আজকের এই সংকটের মূল কারণ। দীর্ঘদিনের সফল ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ (এইচপিএনএসপি) বাতিল করে সবকিছু রাজস্ব খাতে আনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক জটে আটকে যায়। ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা হবে নাকি সরকার সরাসরি কিনবে, আর্থিক লাভ-লোকসান কত এসব নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক কার্যালয়ের ফাইল চালাচালিতেই পার হয়ে গেছে মূল্যবান কয়েক মাস। ফলশ্রুতিতে টিকার মজুত ফুরিয়ে যায় এবং সময়মতো ক্যাম্পেইন করা সম্ভব হয়নি।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, এই ঝুঁকি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ কথা কানে নেয়নি। একজন হামের রোগী ১৬ থেকে ১৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এখন যে বিলম্ব করা হচ্ছে, তাতে সংক্রমণ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, দুই কোটি সিরিঞ্জ কেনা কি বাংলাদেশ সরকারের জন্য এতটাই অসম্ভব যে এর জন্য দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে? শিশুদের জীবন যখন সংকটাপন্ন, তখন কেন জরুরি তহবিল ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক সিরিঞ্জ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলো না?
ইতিমধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ—এই জেলাগুলোতে হাম দ্রুত ছড়াচ্ছে। নাইট্যাগ-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী জুনের মধ্যে ক্যাম্পেইন শেষ করার কথা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি এবং সিরিঞ্জ সংকটে তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।
প্রশাসনের এই ধীরগতি এবং ‘দাতা সংস্থা নির্ভর’ মানসিকতা দেশের টিকাদান কর্মসূচির দীর্ঘদিনের সাফল্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। হামে মৃত প্রতিটি শিশুর রক্তের দায়ভার কি তবে এই অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত নীতি-নির্ধারকরা নেবেন?—এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।
