ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ১৯৮০-র দশকে রাজনৈতিক প্রভাবে উত্তরবঙ্গের সেচ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে গ্রামীণ ব্যাংক। তবে প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এই প্রকল্প কেবল সরকারের আর্থিক লোকসানই বাড়ায়নি, বরং ওই অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নকেও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে সৌদি উন্নয়ন তহবিলের (SED) অনুদানে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরে ২০০০ গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ড. ইউনূস এই প্রকল্পের ১৫০০ নলকূপ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চুক্তি করেন। সেচ কাজে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও ‘গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন’ নামক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রমে যুক্ত হয় ব্যাংকটি।
১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের প্রতিটি নলকূপের বিপরীতে মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা ডাউনপেমেন্ট দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে ৫৬৯টি নলকূপ গ্রহণের পর হঠাৎ করেই চুক্তিভঙ্গ করে তারা। পরবর্তীতে ৫৭৩টি নলকূপের বিপরীতে ৯ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পাওনা দাবি করে বিএডিসি দফায় দফায় তাগিদ দিলেও গ্রামীণ ব্যাংক তা পরিশোধ করেনি।
দীর্ঘদিন পাওনা পরিশোধ না করায় ২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করে বিএডিসি। মামলায় বিএডিসির পক্ষে রায় হলেও ২০২৪ সালে ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর এই আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় আসে।
- আপিল: গ্রামীণ ব্যাংক আদালতের রায়ের বিপরীতে আপিল করে।
- ত্রিপক্ষীয় জরিপ: বিএডিসি, বিএমডিএ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের যৌথ জরিপে দেখা যায়, ৫৭৩টি নলকূপের মধ্যে মাত্র ১৭৯টি এখন গ্রামীণ ব্যাংকের অধীনে আছে।
- বিতর্কিত সুপারিশ: গত ১৪ জানুয়ারি এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়, গ্রামীণ ব্যাংক কেবল বর্তমানে তাদের অধীনে থাকা ১৭৯টি নলকূপের দাম বাবদ ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা পরিশোধ করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৮ বছর আগের ডাউনপেমেন্ট সমন্বয় করে এই নামমাত্র মূল্যে সমঝোতা করা সরকারের স্বার্থবিরোধী এবং আইনিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
বিএডিসির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কারিগরি দক্ষতা না থাকায় গ্রামীণ ব্যাংকের অধীনে থাকা অধিকাংশ দামী নলকূপ অকেজো হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “এমন একটি সময়ে এই সমঝোতা করা হয়েছে যখন ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা নিজেই সরকারের প্রধান। এখানে সততা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচিত সরকারের উচিত একটি স্বতন্ত্র কমিটির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করা।”
নোবেল বিজয়ী একটি প্রতিষ্ঠানের এমন বাণিজ্যিক ব্যর্থতা এবং সরকারি অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা গ্রামীণ ব্যাংকের ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
