নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত ও কারাগারের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিভিন্ন কারাগার ও পুলিশি হেফাজতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মৃত্যুর ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এমনই এক ঘটনায় বগুড়া থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা শাহনূর আলম শান্ত (৬০) কারাবন্দি অবস্থায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গ্রেপ্তারের আগে পঙ্গু এই প্রবীণ নেতার ওপর নৃশংস মব হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাত ১০টার দিকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বগুড়া জেলা কারাগারের জেলার নুরুল মুবীন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কারা সূত্র ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শাহনূর আলম শান্ত বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের নিজবলাইল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন।
২০১৮ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। এরপর থেকে তিনি কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে চলাফেরা করতেন।
পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুরু হওয়া গ্রেপ্তার ও সহিংসতার আশঙ্কায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। গত ৪ জানুয়ারি দুপুরে তিনি গোপনে বগুড়া শহরের নারুলী কৃষি ফার্ম এলাকায় স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তাকে চিনতে পেরে আটক করে মারধর করে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে বগুড়া সদর থানায় নিয়ে যায়। পরে বগুড়া জেলা মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক সুরাইয়া জেরিন রনির দায়ের করা নাশকতা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৭ জানুয়ারি তাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাতে তার মৃত্যু হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, মারধরে গুরুতর আহত হওয়ার পরও পুলিশ তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে তাকে কারাগারে পাঠায়। পরে দীর্ঘদিন অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক অমিত হাসান মাহমুদ বলেন, শাহনূর আলম শান্ত এক পা হারানো অবস্থায় কৃত্রিম পায়ে চলাফেরা করতেন। নারুলী কৃষি ফার্ম এলাকায় আসার সময় স্থানীয় লোকজন তাকে চিনতে পেরে আটক করে এবং মারধর শুরু করে। পরে ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
নিহতের ছোট ভাই ফারুক মিয়া জানান, শান্তের একমাত্র মেয়ে বগুড়ার বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
শাহনূর আলম শান্তর মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মরদেহ গ্রহণের জন্য কেরানীগঞ্জ কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করছেন। পরে নিজ গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর বগুড়া জেলা কারাগারে গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন। এই নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
