ইঞ্জিন বন্ধ রেখে তেল বাঁচানো: যে সরকার দেশ চালায়নি, শুধু গল্প বুনেছে!
সমাপ্তি হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য শাসনের। প্রফেসর ইউনূসের থ্রি জিরো শাসন — ০ জবাবদিহিতা, ০ আইনের শাসন, ০ সততা। তবে একেবারেই সফলতা ছিল না, সেটা বলাও ঠিক হবে না। বাগাড়ম্বর আর প্রচারে এই সরকার ছিল ‘একশো-একশো’। মজার ব্যাপার হলো, সরকারের প্রস্থানের পরও তাদের মিথ্যা প্রচারণার অভিযান থেমে নেই; কিসের আশায় সেটা যদিও পরিষ্কার নয়। এই লেখায় তেমনই কিছু অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব।
ইতিহাসে সব সরকারের আমলেই ভালো-মন্দ ছিল—কেউ উন্নয়ন করেছে, কেউ দুর্নীতি করেছে, কোথাও আইনশৃঙ্খলা ভালো ছিল, কোথাও খারাপ। কিন্তু ইন্টারিম সরকারের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে—ন্যূনতম শাসনব্যবস্থাটুকুও কার্যকর ছিল না। অনেককে নির্দ্বিধায় বলতে শুনেছি — “দেশে কোনো সরকার নেই!”। অবিশ্বাস্য এক মবের মুল্লুকে পরিণত হয়েছিল দেশ। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, দখল, হামলা, মব—এগুলো দমন না হয়ে বরং ক্ষেত্রবিশেষে উৎসাহিত হয়েছে। মাঠ প্রশাসন/পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয়। সরকারের স্পষ্ট সমর্থনে যখন মব পরিচালিত হচ্ছিল, তখন প্রশাসনের পক্ষে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। তবে পুলিশ পুরোপুরি নীরব ছিল, তাও নয়। কারও বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, আবার কারও বিষয়ে সম্পূর্ণ চুপ—ফলে আইনের শাসন নয়, বরং “কার পক্ষে কে”ঘরানার সেই পুরোনো রাজনীতির ধারাবাহিকতাই দেখল দেশবাসী। একদিন এখানে অবরোধ, তো পরদিন ওখানে আন্দোলন—এমন নৈরাজ্যের মধ্যে সাধারণ মানুষকে চরম নিরাপত্তাহীনতা আর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই দিন কাটাতে হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার কথা এলেও বাস্তবে কোনো শক্ত পদক্ষেপ বা ফলাফল চোখে পড়েনি। ইলিশের দাম নিয়ে এবং ভারতে রপ্তানি নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে শেষ পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়ে বসে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের মুখে বড় বড় প্রতিশ্রুতি থাকলেও নাগরিকদের কাছে মাপযোগ্য কোনো অগ্রগতি বা নির্দিষ্ট সময়সীমা পরিষ্কার ছিল না। আগের সরকারগুলো অন্তত কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্র চালানোর ন্যূনতম কাঠামো বজায় রাখত। এই সরকারের সময় অনেক জায়গায় মনে হয়েছে—রাষ্ট্রটা চলছে না, শুধু বক্তব্য চলছে। তার ওপর বাণিজ্য চুক্তির নামে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাগাম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা তো পূর্ববর্তী কোনো সরকারই করেনি।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এত ব্যর্থতার পরও সরকারকে কখনোই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়নি। অনেকেই বলেন আমলারা নাকি সরকারের পক্ষে ছিলেন না, তাই সরকার ঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। আসলেই কি সে রকম মনে হয়েছে? আমরা তো সরকার গঠনের সাথে সাথেই প্রশাসনে বিরাট রদবদল দেখলাম। এমনকি বিচার বিভাগও পুরোটাই পরিবর্তন হয়ে গেল। সরকার একটার পর একটা দেশবিরোধী চুক্তি করে গেল, কোনো আমলাকেই তো বাধা দিতে দেখলাম না। এমনকি জনসম্মুখে এসে সরকারের অপকর্ম প্রকাশ করে দিতেও দেখলাম না। সরকারকে বরং সাহায্যই করলেন তারা, যেমনটা সব সরকারকেই করেন। জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একটি উদাহরণই যথেষ্ট। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ দলের বিদায়ের পর হতাশ খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনায় তিনি তাদের দুশ্চিন্তা না করতে বলে মন্তব্য করেন, “নতুন সরকার এলে সব ঠিক হয়ে যাবে।” অর্থাৎ, বিষয়টি সমাধান করাকে তিনি নিজের দায়িত্ব মনেই করেননি। আরও স্পষ্ট করে বললে, সম্ভবত তিনি নিজেই নিজেকে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল কেউ বলে মনে করেননি; জবাবদিহিতা তো অনেক দূরের বিষয়!
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমর্থকদের কিছু কিছু লেখা পড়লে মনে হয় ১৮-২০ মাসে বাংলাদেশে “অলৌকিক উন্নয়ন” হয়ে গেছে। কিন্তু যদি বাস্তব তথ্য, সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট দেখি, তাহলে যে চিত্রটা আসে সেটা একদমই আলাদা — এবং এটি তাদের ন্যারেটিভকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেয়। আসুন এরকম কিছু অপপ্রচার সম্পর্কে জেনে নেই।
১) “২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার” — এই সংখ্যাটি নিয়ে অনেক চর্চা হয়েছে। এটাকে সামলে নিতে নাকি সরকারের রীতিমত ঘাম ঝরে গিয়েছে! অথচ এটি প্রমাণিত ফ্যাক্ট নয়। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার সংখ্যাটি কোনো বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা সরকারি অডিটেড হিসাবের সংখ্যা নয়। এটা মূলত কিছু ডকুমেন্টারি/অনুমানভিত্তিক রিপোর্ট থেকে ভাইরাল হয়েছে। এ ধরনের গবেষণা অনেক সময়ই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার অংশ হয়ে থাকে। অর্থপাচারের ঘটনা বিভিন্ন তদন্তে পাওয়া গেছে—এটি সত্য—কিন্তু মোট অঙ্কটি ঠিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার, এমন কোনো নিশ্চিত ও স্বীকৃত আন্তর্জাতিক বা জাতীয় উৎস নেই। এই সংখ্যা প্রমাণিত হিসাব না হওয়ায় এটাকে প্রকৃত তথ্য ধরে নেওয়া সংবেদনশীল ভুল।
২) “রিজার্ভ ১৯ থেকে ৩৪ বিলিয়ন” — এটা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। রিজার্ভ বাড়া ভালো খবর হতে পারে, কিন্তু শুধু এটা দেখেই অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বোঝা ভুল হবে। রিজার্ভ বাড়ে তখনই, যখন দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়ে অথবা ডলার খরচ কমে যায়। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হচ্ছে ডলার কম বের হওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ সময়ে import LC settlement (আমদানির এলসি পরিশোধ) প্রায় ১০–১১% কমেছে, শিল্পের intermediate goods (কাঁচামাল) আমদানি প্রায় ৮–৯% কমেছে, এবং নতুন বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সূচক capital machinery (শিল্প উৎপাদনের যন্ত্রপাতি) আমদানি প্রায় ২৫% কমেছে।
ডলার খরচ কমার মূল কারণগুলো ছিল—
- ব্যবসায়িক মন্দা: দেশে উৎপাদন কার্যক্রম ধীর হয়ে যাওয়ায় শিল্পের কাঁচামাল (raw materials) আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
- শিল্পের অচলাবস্থা: অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং কারখানা ঠিকমতো চালু না থাকায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানির প্রয়োজন হয়নি। আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ এর মধ্যে প্রায় ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ১ লাখ শ্রমিক প্রভাবিত হয়েছে বলে বিভিন্ন শিল্প প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
- মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস: বাজারে সাধারণ মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮–১০% এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০%-এর উপরে ছিল, ফলে পণ্যের চাহিদা কমে গেছে, যা সরাসরি ভোগ্যপণ্য আমদানি কমাতে বাধ্য করেছে।
- দারিদ্র্যের চাপ: দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়লে তারা সবচেয়ে বেশি খরচ কমায়। এর প্রভাবও আমদানি হ্রাসে পড়েছে।
- ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্বলতা: এলসি খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও ব্যাংকিং খাতের ওপর চলমান চাপ ডলার বের হওয়ার পথ রুদ্ধ করেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো মানুষের আয় ও ভোগের চিত্র। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ২০.৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে শ্রমবাজারেও দুর্বলতার লক্ষণ দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৩০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারের বাইরে চলে গেছে, যার মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ নারী। মোট কর্মসংস্থানও ২০ লাখ কমে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৯১ লাখে দাঁড়িয়েছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ। আইএমএফ-এর প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই দফায় প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি পায় সরকার এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তাও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। অতএব, রিজার্ভের এই বৃদ্ধিকে সরাসরি পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। এটি অনেকটা “ইঞ্জিন ঠিক হওয়ার” পরিবর্তে “ইঞ্জিন বন্ধ রেখে তেল বাঁচানোর” মতো একটি কৃত্রিম অবস্থা।
৩) “২১ লক্ষ কোটি ঋণ শোধ” — এটা একটি অসম্ভব দাবি! বাংলাদেশে সরকারি ঋণের মোট স্টক (debt stock) কমেনি — বরং সাম্প্রতিক সময়ে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার কিছু ঋণ শোধ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ঋণও নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণের নতুন গ্রহণ ৩.২৮ লাখ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো এক অর্থবছরে ঋণগ্রহণের রেকর্ড। মোট সরকারি ঋণ ২২.৫ লাখ কোটির উপরে এসে দাঁড়িয়েছে। অতএব শোধ নয়, বরং ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে। ২১ লক্ষ কোটি টাকা যদি সত্যিই শোধ হয়ে যেত, তাহলে তো বাংলাদেশ কার্যত প্রায় ঋণমুক্ত দেশের কাতারেই চলে যেত—যা বাস্তবতার সাথে মোটেই মেলে না। এত বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ হয়ে গেলে সেটি নিঃসন্দেহে বিশ্ব-অর্থনীতির ইতিহাসে এক ধরনের ‘ম্যাজিক’ হিসেবেই লিপিবদ্ধ হতো। পুরো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই সম্ভবত অর্থনীতিতে ‘নোবেল ’ পেত!
৪) “বাণিজ্য চুক্তি: ৩৭% থেকে ১৯%” — এটি একটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। বাস্তবে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ৩৭% পারস্পরিক কর নির্ধারণ করে, যা পরবর্তীতে কমে ২০% এ নেমে আসে। বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সেটি ১৯% এ নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ বাস্তবে বিষয়টি ৩৭% থেকে ১৯%-এ নামার ঘটনা নয়; বরং ২০% থেকে ১৯%-এ সামান্য কমার বিষয়। এই বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো, প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আমি আলাদাভাবে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ লিখেছি। আমার মূল্যায়নে, এই চুক্তির কিছু শর্ত এমনভাবে নির্ধারিত হয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও নীতিগত স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়টাই এরকম নানা প্রচারণায় অতিবাহিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই একদম ভুল তথ্য নির্লজ্জভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তথ্যের ভিত্তিতে ন্যারেটিভ সৃষ্টি হতেই পারে, তাই বলে তথ্যটাই বানিয়ে বলতে হবে? আসলে সত্যটাই অপ্রিয় হলে, মিথ্যা ছাড়া উপায় থাকে কি?
লেখকঃ শাদমান সাকিব সৌমিক
