নিজস্ব প্রতিনিধি : অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের সাড়ে তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও সেই সরকারের উপদেষ্টারা এখনো আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়ে গেছেন। একদিকে হামে ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে, অন্যদিকে সাবেক কয়েকজন উপদেষ্টা ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়ে মুখ খোলায় নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অধিকাংশ আলোচিত উপদেষ্টা এখনো অন্তরালে সময় পার করছেন। তীব্র ‘মব আতঙ্ক’ ও ক্ষোভের মুখে তাদের কেউ দেশ ছেড়েছেন, আবার কেউ আগের পেশায় ফিরলেও জনসমাগম এবং গণমাধ্যমকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলছেন।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৭শে মে দীর্ঘদিনের সহকর্মী লামিয়া মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সের প্যারিসের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। পরে ৩১শে মে তাঁদের জার্মানিতে হিটলার ও তার প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের শোবার ঘরের সামনে ‘বার্লিন স্টোরি বাঙ্কার’ মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।
এদিকে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন ও সাবেক খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার একাধিক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে সাত সদস্যের একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সক্রিয় ছিল, যেখান থেকেই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তৌহিদ হোসেন জানান, অন্য উপদেষ্টাদের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের কারণে তিনি অন্তত তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম কার্যত আত্মগোপনে চলে গেছেন। মবের শিকার হতে পারেন এই ভয়ে তিনি রাজধানীতে নিজের ফ্ল্যাটে অনেকটা গৃহবন্দি জীবন যাপন করছেন এবং নিকট আত্মীয়দেরও নিজের ঠিকানা জানাচ্ছেন না।
সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অনেকটা নীরবে স্ত্রী তিশাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, প্রত্যেকটা ভালো কাজের একটা কাফফারা দিতে হয় জেনেই সরকারে ঢোকার ঝুঁকি নিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা যে এইরকম ভয়াবহ হবে তা ভাবেননি।
অবশ্য বিতর্কের বাইরে থাকা অধিকাংশ সাবেক উপদেষ্টাই দেশে ফিরে পুরোনো পেশায় যোগ দিয়েছেন। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন এবং আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ‘বেলা’র প্রধান নির্বাহী হিসেবে এবং সাবেক শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান নিজের এনজিও ‘অধিকার’-এ ফিরেছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার উবিনীগে ফিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করছেন।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বারিধারার বাসায় বই লেখা ও ছবি আঁকার কাজে সময় দিচ্ছেন এবং সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন নিজের প্রতিষ্ঠান আকিজ-বশির গ্রুপে সময় দিচ্ছেন। সাবেক সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ দীর্ঘ বিরতির পর উত্তরায় নিজের কর্মস্থল ব্রতীর কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস শুরু করেছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান টেকনোক্র্যাট কোটায় নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন এবং সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া অন্যান্য উপদেষ্টারাও দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত হয়েছেন।
