ওয়েস্টার্নে দর্শনে পিএইচডি করতে গেলে কোর্সওয়ার্কের পাশাপাশি অনেকগুলো নন-ক্রেডিট মাইলস্টোন পাস করতে হয়। এর মধ্যে আছে এথিকস ইন্টিগ্রিটি, লজিক কমপিটেন্সি, কম্প্রিহেন্সিভ এক্সাম, প্রসপেক্টাস কোর্স (মনে হয় ভুলে গেছি আরো ২/১টা আছে)। এগুলো পাস করা যে খুব কঠিন বিষয়টি তেমন নয়। তবে এতো টাইট স্কেজুল থাকে যে জীবনে আর কোন দিকে তাকানোর সময় থাকে না। সারাক্ষণ মনে হয় কেউ একজন আমার উপরে সিসি ক্যামেরা ধরে রেখেছে। তার উপরে আবার ডিপার্টমেন্টের অনেক কাজ যেমন গ্রাজুয়েট কনফারেন্স আয়োজন, নিয়োগের সময় রিভিউ লেটার দেওয়া, শহরে প্রতি বছর হাইস্কুল স্টুডেন্টদের জন্য এথিকস বওল হয়, তার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন, পরীক্ষার প্রক্টরিং, টিএ হিসেবে কাজ এগুলো তো আছেই।
এতো কিছুর পর কার সময় থাকে পার্টনারের সাথে রোমাঞ্চ করার? অনেক দম্পতির ডিভোর্স হয়, অনেকের সংসারে স্থায়ী একটা ফাঁটল পড়ে। অনেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায়। গত বছর মিশরীয় আমার এক রুমমেট ছিল। সে হার্ভার্ডে রিসার্চ এসিস্টেন্ট হিসেবে দুই বছর কাজ করেছে। এখানে পিএইচডি শুরু করেছিল। কিন্তু সেদিন বেড়াতে এসে জানালো মাস্টার্স করে চলে যাচ্ছে। কারণ সে স্ট্রেস না নিতে পেরে ডিপ্রেশনে ভুগছে। নিয়মিত ডিপ্রেশনের ওষুধ খাচ্ছে।
এতো চাপ এবং কষ্টের মধ্যে আনন্দের বিষয় কি জানেন? আপনি সত্যিকার অর্থেই স্কলার হবেন। এত কিছু শিখবেন যে নিজের জানার আনন্দে নিজে বিমোহিত হবেন। আপনি তাদের হাতে পড়েছেন মানে আপনাকে আগুনে পুড়িয়ে হাতুড়ি পেটা করে একেবারে খাঁটি সোনাতে পরিণত করবে। সেই কাজটা তারা মারাত্মক দায়িত্বের সাথে করে।
এতো কথা বললাম তার একটা কারণ আছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের আবার ক্লাসে ফেরাতে হলে পড়াশোনা কঠিন করতে হবে। কঠিন মানে তাদের সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখতে হবে। এই ব্যস্ততায় সে টের পাবে না কবে রবিবার আসলো আর সপ্তাহ শেষ হয়ে গেল। পরীক্ষা, এসাইনমেন্ট এবং প্রেজেন্টেশনের চাপ তাকে জানার আনন্দ দিবে। বছরের সবগুলো কোর্স তিনটা সেমিস্টারে ভাগ করে শেষ করা যেতে পারে।
আর চারদিকে হরেদরে পিএইচডি ঠেকাতে হলে নর্থ আমেরিকান সিস্টেম চালু করুন। আরামের চাকরি থাকতে কেউ ভুল করেও পিএইচডি করার কথা চিন্তা করবে না। তাতে পিএইচডির মান বাড়বে, সংখ্যা কমবে। রাস্তাঘাটে এত পিএইচডি দেখতে ভালো দেখায় না।
আজ প্রেজেন্টেশন দেওয়ার পর বুঝতে পারছি মাত্র দশ মিনিটের প্রেজেন্টেশন কতটা কার্যকর। প্রেজেন্টেশন শেষে টার্কিশ এক পিএইচডি স্টুডেন্ট আমার অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করলো, কিছু পরামর্শ দিলো। ফেরার পথে লাইব্রেরি থেকে বই তুলে বাসায় এসে পরোটা গরম করে মা মেয়ে কেবল একটু ঘুমাতে গিয়েছি, দেখি সুপারভাইজার ইমেল দিয়েছেন। যে ড্রাফট জমা দিয়েছি, সেটি পড়েছেন এবং মিটিংয়ের সময় চেয়েছেন।
তাঁকে লম্বা একটা ইমেইল দিয়েছি যার মধ্যে ওয়েস্টার্ন লাইব্রেরিতে প্রায়ই আমার কাজের বইটা পাওয়া যায় না এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে বই ধার কর পড়তে হয় এবং তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় সেটিও ছিল। সেই সাথে কি কি বই নতুন সংযোজন করা যেতে পারে তার একটা লিস্ট দিয়েছি যাতে ডিপার্টমেন্ট বইগুলো লাইব্রেরিতে রাখার ব্যবস্থা করতে পারে।
আপনাদের নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে প্রসপেক্টাস কী। প্রসপেক্টাস পিএইচডি থিসিস প্রোপোজাল। এই প্রপোজাল লেখার কাজ পিএইচডি স্টুডেন্ট ডিপার্টমেন্টে একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করে থাকে। প্রতি সপ্তাহে ছোট ছোট এসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়। সেমিস্টার শেষে পুরো প্রসপেক্টাস সাবমিট করতে হয়।
প্রসপেক্টাস কোর্সে পাস করাই শেষ নয়। এই প্রসপেক্টাস ডিপার্টমেন্টের একটি কমিটির সামনে প্রেজেন্ট করতে হয় এবং ডিফেন্স দিতে হয়। কমিটি যদি এপ্রুভ করে তবেই ছাত্র থিসিস শুরু করতে পারবে। এখানে বলে রাখা ভালো যে প্রসপেক্টাস মানে হলো পিএইচডি স্টুডেন্ট এবং সুপারভাইজারের মধ্যকার একটা চুক্তি। স্টুডেন্ট সুপারভাইজার এবং কমিটিকে জানাবে সে কী কী করতে যাচ্ছে এবং তার প্রেক্ষিতে সুপারভাইজার তাকে ডিগ্রি দিতে সম্মত কিনা সেটি বিবেচনা করবেন। তিনি যদি মনে করেন যে কাজটি নতুন জ্ঞান তৈরি করতে পারবে এবং এই বিষয়ে গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ তবে তিনি সম্মত হবেন। আর কমিটি সেখানে কিছু অতিরিক্ত পরামর্শ দিতে পারেন যাদের কাজ হচ্ছে সুপারভাইজার এবং স্টুডেন্টের মধ্যকার এই চুক্তিটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে সেটি পর্যবেক্ষণ করা।
আমি চাই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই নিয়ম চালু হোক। অনেক পিএইচডি স্টুডেন্ট আছে যারা জানেই না প্রপোজাল কীভাবে লিখতে হয়।
লেখার সাথে একমত হলে জাতির স্বার্থে শেয়ার করতে পারেন। সাংবাদিক স্যারেরা অবশ্য এই লেখা নিয়ে নিউজ করবেন না। কারণ এর মধ্যে ইনসেইন পলিটিক্স নেই।
লেখকঃ নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
