২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সদস্য হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ দেড় বছর পর তদন্তে অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর আগে জানিয়েছিল, আন্দোলন চলাকালে ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। তবে অনেক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আন্দোলনের সময় থানায় হামলা, অস্ত্র লুট, অগ্নিসংযোগ এবং সদস্য হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচটি মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তদন্তে নতুন উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ হত্যা ও স্থাপনায় হামলার বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় আসে। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে বিস্ময়ও প্রকাশ করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি ঘটনার গভীরে গিয়ে তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজন হলে নতুন করে মামলা করা হবে।
তিনি বলেন, অনেক ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি রেকর্ড ও অন্যান্য আলামত আগে থেকেই সংগ্রহ করা রয়েছে। তবে পূর্ববর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ‘সংকেত’ না থাকায় তদন্ত এগোয়নি। এখন তদন্ত শুরু হলে “রাঘববোয়ালরাও” আইনের আওতায় আসতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার মধ্যে ২১টিসহ মোট ২১৬টি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর মধ্যে ১৩টি থানা সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
থানায় হামলা, অস্ত্র লুট ও সদস্য হত্যার ঘটনায় আরও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে ডিএমপির যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি এবং সিএমপির কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা হয়েছে।
কারাগার ভাঙচুর ও পলাতক বন্দি
আন্দোলনের সময় কারাগারে হামলা চালিয়ে বন্দি ছিনতাই ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। দেয়াল ও গেট ভেঙে অনেক বন্দি পালিয়ে যান। তাদের ধরতে বিশেষ অভিযান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরে ক্ষোভ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত বড় ঘটনার পরও তদন্ত না হওয়ায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। তবে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলেননি। এখন নতুন সরকারের নির্দেশনার পর তদন্ত কার্যক্রম গতি পাবে বলে আশা করছেন তারা।
এক কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশ হত্যা ও থানায় লুটপাটের ঘটনা কখনো তামাদি হয় না। যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”
চলমান মামলার জটিলতা
অন্যদিকে, আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও শতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলা রয়েছে ৬০০–এর বেশি।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলোচিত ৬৮টি মামলা তদন্ত করছে। এছাড়া সিআইডিসহ অন্যান্য ইউনিটও তদন্তে যুক্ত রয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, অনেক এজাহারের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না; তাই কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ ও টেলিভিশন সম্প্রচারিত ভিডিও বিশ্লেষণ করে নতুন করে যাচাই-বাছাই চলছে।
সামনে কী
পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, নতুন নির্দেশনার আলোকে সব ঘটনার ছায়াতদন্ত এখন পূর্ণাঙ্গ তদন্তে রূপ নিতে যাচ্ছে। হামলা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুট ও সদস্য হত্যার ঘটনাগুলো পৃথকভাবে খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় নিহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মামলাগুলোরও দ্রুত তদন্তের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
