নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ও জটিল এক সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং দলটির নির্বাচনী প্রতীক নৌকা বাতিলের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এ প্রেক্ষাপটেই ক্ষমতাচ্যুত ও স্বেচ্ছানির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নো বোট, নো ভোট’ স্লোগান সামনে এনে আসন্ন নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আবেদনপত্রে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দলটির বক্তব্য, নৌকা প্রতীক ছাড়া এবং আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন বৈধ হতে পারে না।
গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণআন্দোলনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
এর ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল এবং দলটির বহুল পরিচিত নির্বাচনী প্রতীক নৌকা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে দলটি কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে পড়ে যায়।
‘নো বোট, নো ভোট’: কৌশল না প্রতিবাদ
আওয়ামী লীগের প্রকাশিত আবেদনপত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘দমনমূলক’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কঠোর নিরাপত্তা, ভয়ভীতি ও নিয়ন্ত্রণের পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার আহ্বান—যে ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকবে না এবং যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না, সেখানে দলটির সমর্থকদের কেউ যেন ভোট দিতে না যান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বর্জনের ঘোষণা কেবল প্রতীক হারানোর প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি দলটির অস্তিত্ব সংকট, রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই এর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
এর কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নির্বাচন বর্জনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারে না এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করা যায় না।
বর্তমান ঘোষণার মাধ্যমে সেই অবস্থানই আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও আয়োজন করা হবে। মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই ও আপিল প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে চলমান। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হবে ২১ জানুয়ারি এবং ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার।
তবে আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটার উপস্থিতি এবং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বর্জনের ফলে একদিকে নির্বাচন একতরফা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের চাপ আরও বেড়েছে।
