নিজস্ব প্রতিবেদক
‘শিবিরপন্থী শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি’ নিয়ে চলমান আলোচনার দৃষ্টি ঘোরাতেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান’কে প্রকাশ্যে টেনেহিঁচড়ে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের প্রশাসন গত প্রায় ১৫ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে অন্তত ২৫০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া আরও অন্তত ৩০৪ জনকে নিয়োগ দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
এ নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে—নিয়োগগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধূরী বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সাধারণ প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
তবে উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, লিখিত, মৌখিক ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ইউজিসির চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজও বলেছেন, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তদন্ত হবে।
জামায়াত ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে দল-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
নিয়োগ বিতর্ক আরও আলোচনায় আসে ফাইন্যান্স বিভাগে প্রভাষক পদে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীমের নিয়োগ অনুমোদনকে কেন্দ্র করে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, তুলনামূলক কম সিজিপিএ থাকা সত্ত্বেও তাঁর নিয়োগ অনুমোদন দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান বলেছেন, তিনি ওই নিয়োগ বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
এ ছাড়া ফাইন্যান্স বিভাগে এক শিক্ষকের সন্তানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ এবং চবি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে রেজিস্ট্রারের ভাইয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটেই গত শনিবার দুপুরে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে চাকসুর কয়েকজন নেতা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ধরে নিয়ে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাকসুর কয়েকজন নেতা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে একটি অটোরিকশায় তুলছেন। পরে তাঁকে প্রক্টরের কার্যালয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা এবং সহ-উপাচার্যের কার্যালয়ে আরও দুই ঘণ্টা রাখা হয়। এ সময় তাঁর মুঠোফোন তল্লাশির অভিযোগও ওঠে।
রাতের দিকে তাঁকে প্রক্টরের গাড়িতে করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা জানানো হয়।
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আর রাজী বলেন, সম্মতি ছাড়া কাউকে জোর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া আইনগতভাবে অপরাধের শামিল।
ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জি এইচ হাবীব বলেন, অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
চাকসুর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমানও ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে চাকসুর উচিত ছিল প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়ে অবস্থান নেওয়া।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম এক বিবৃতিতে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।
চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় দাবি করেন, ঘটনাটি পরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও গোষ্ঠীগত প্রভাবের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না—সেটিও প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক মনে করছেন, অভিযোগের নিষ্পত্তি প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত এবং প্রকাশ্যে হেনস্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
