আজ ১৪ জানুয়ারি, বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি অথরোটি (বিটিআরসি) ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বরাদ্দের তথাকথিত নিলাম আয়োজন করতে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে একে “নিলাম” বলা হলেও বাস্তবে এটি গ্রামীণফোনকে দেওয়া একটি সাজানো উপহার—যার প্রকৃত সুবিধাভোগী একেবারেই স্পষ্ট।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র দেড় মাসে, প্রায় নীরবে শেষ করা হয়েছে। আগ্রহ দেখিয়েছে গ্রামীণফোন ও রবি—কিন্তু শেষ মুহূর্তে রবিকে বাদ দিয়ে, মাঠে একমাত্র গ্রামীণফোনই থাকছে। চূড়ান্ত পরিকল্পনা হলো:
২৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম – ১৫ বছরের লাইসেন্স – বেজ প্রাইস মাত্র ২৩০ কোটি টাকা।
এখন প্রশ্ন হলো—এটা কি সত্যিকারের নিলাম, নাকি গ্রামীনফোন তথা নিজেকেই দেয়া ইউনুসের উপহার?
চলুন, বিষয়টা বুঝার চেষ্টা করি।
৭০০ মেগাহার্টজ কী? কেন একে “Golden Spectrum” বলা হয়?
৭০০ মেগাহার্টজ হলো লো-ব্যান্ড স্পেকট্রাম। অর্থাৎ এর মাধ্যমে,
- কম টাওয়ারেই বিশাল এলাকা কাভার করা যায়
- গ্রাম, পাহাড়, নদী ও ভবনের ভেতর সিগন্যাল সহজে ঢোকে
- 4G ও 5G নেটওয়ার্কের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ব্যান্ড
- অপারেটরের খরচ কমে, নেটওয়ার্ক ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ে
এই কারণেই পৃথিবীর সব দেশ ৭০০ মেগাহার্টজকে রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখে। এটাকে কখনোই তাড়াহুড়ো করে ছাড় দেওয়া হয় না। বরং দীর্ঘ প্রস্তুতি, স্বচ্ছ নীতি এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অন্য দেশ কীভাবে ৭০০ মেগাহার্টজ বরাদ্দ দেয়?
ভারত: ডিজিটাল টিভি শিফট, স্পেকট্রাম রিফার্মিং, একাধিক নীতি সংশোধনের পর নিলাম
ইউরোপ: ৫–৭ বছরের প্রস্তুতি, বাজার বিশ্লেষণ, মাল্টি-অপারেটর ব্যালান্স
যুক্তরাষ্ট্র: পাবলিক কনসালটেশন, কংগ্রেসনাল নজরদারি, ওপেন ও স্বচ্ছ অকশন
কোনো দেশই দেড় মাসে, নীরবে, এক কোম্পানির জন্য ৭০০ মেগাহার্টজ ছেড়ে দেয় না।
বাংলাদেশ কি আদৌ প্রস্তুত? সোজা উত্তর—না। কারণ,
- নেটওয়ার্ক শেয়ারিং নীতি দুর্বল
- টেলিকম বাজারে প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই অসম
- স্পেকট্রামের ন্যায্য ও স্বাধীন মূল্যায়ন হয়নি
এই অবস্থায় ৭০০ মেগাহার্টজ বরাদ্দ দিলে কী হবে?
গ্রামীণফোনের কাভারেজ ও খরচ-সুবিধা এতটাই এগিয়ে যাবে যে বাস্তবে একচেটিয়া আধিপত্য (monopoly) তৈরি হবে।
লাভবান কে?
এখানে “কোম্পানি” নয়, ব্যক্তি ও স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণফোনের ৩৪.২% শেয়ারের মালিক হলো গ্রামীণ টেলিকম, যার একক নিয়ন্ত্রণ ইউনুসের হাতে।
রাষ্ট্রের গোল্ডেন স্পেকট্রাম যদি কম দামে, প্রতিযোগিতা ছাড়া, একচেটিয়াভাবে গ্রামীণফোন পায়—তাহলে লাভ কার পকেটে যাবে, সেটা বুঝতে আর কোন ব্যাখ্যার দরকার আছে বলে মনে হয় না।
দ্বিচারিতা কোথায়?
একদিকে বিটিআরসি NEIR বাস্তবায়নের নামে মোবাইল ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলেছে, বাজার অস্থির করেছে। অন্যদিকে সেই অস্থিরতার আড়ালে সকলে চোখ ফাঁকি দিয়ে গোল্ডেন স্পেকট্রাম তুলে দেওয়া হচ্ছে গ্রামীণফোনকে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নিলাম বন্ধে হাইকোর্ট-এ রিট করা হয়েছিলো, কিন্তু আশ্চর্যভাবে কোনো বিচারক রিট শুনতে রাজি হয়নি।
শেষ কথা
৭০০ মেগাহার্টজ কোনো সাধারণ লাইসেন্স নয়। এটা ভবিষ্যতের ইন্টারনেট, গ্রামের কানেক্টিভিটি, এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব।
এই স্পেকট্রাম যদি তাড়াহুড়ো করে, গোপনে, একচেটিয়া সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে ক্ষতিটা হবে দেশের, জনগণের এবং পুরো টেলিকম সেক্টরের।
