কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ‘ছাত্রলীগকর্মী’ হিসেবে সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তার হওয়া এক স্কুলছাত্র বর্তমানে কারাগারে থাকায় তার বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কারাবন্দি ওই ছাত্রের নাম ইমরান হোসেন, সে নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির নিয়মিত শিক্ষার্থী।
গত বৃহস্পতিবার (গতকাল) তার বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বর্তমানে সে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি।
পুলিশ জানায়, গত সোমবার (তারিখ উল্লেখ নেই) গভীর রাতে পুলিশ তাকে ‘ছাত্রলীগকর্মী’ সন্দেহে আটক করে এবং পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ইমরান ঢালুয়া ইউনিয়নের চিওড়া গ্রামের ডেকোরেটর ব্যবসায়ী ইসহাক মিয়ার ছেলে।
নাঙ্গলকোট থানার এসআই আলমগীর হোসেন ওই দিনই মোট ২৫ জন নামীয় এবং ৫০-৬০ জন অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় স্কুলছাত্র ইমরান হোসেনকে ৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে কুমিল্লার শিশু আদালত-১-এর মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার এজাহারে ইমরানের পরিচয় ‘ছাত্রলীগকর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, মনতলী ব্রিজের পাশে চিলপাড়া-উরকুটি রাস্তায় কুমিল্লা ও আশপাশের উপজেলার ৫০-৬০ জন সক্রিয় সদস্য (ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের) একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রতিবাদে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয় এবং মশাল মিছিল করে। পুলিশ সেখান থেকে ১ নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করে এবং তার জিজ্ঞাসাবাদে স্কুলছাত্র ইমরানসহ অন্যদের নাম জানতে পারে।
ইমরানের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। ইমরানের বাবা ইসহাক মিয়া জানান, তার ছেলে কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়।
ইসহাক মিয়া সমকালকে বলেন, গত সোমবার রাত ৩টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে ইমরানকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর তিনি ছেলের পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিয়ে থানায় গেলেও কোনো লাভ হয়নি। পরবর্তীতে আদালতও তার জামিন মঞ্জুর করেননি।
ইসহাক মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সবার ছেলে-মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, আমার ছেলেটার জীবনটা শেষ করে দিল পুলিশ। ওর বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। কিন্তু নির্দোষ ছেলেটা এখন কারাগারে। আমার মনে হচ্ছে, কেউ ষড়যন্ত্র করে পুলিশকে দিয়ে আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করিয়েছে। আমার ছেলে যে ছাত্রলীগের মিছিলে ছিল, এমন কোনো প্রমাণও নেই। সন্দেহের বশে ওকে ফাঁসানো হয়েছে। ছেলের মুক্তির জন্য আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।”
ঢালুয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলাল হোসেন মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ইমরান তাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ছাত্র এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কোনো তথ্য তার কাছে নেই। তিনি অবিলম্বে ছাত্রটির মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
নাঙ্গলকোট থানার ওসি এ কে ফজলুল হক দাবি করেন, ঘটনার রাতে আটক হওয়া অন্য কয়েকজনের বক্তব্য থেকে ইমরানের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা ইমরানকে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে এবং ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ওসি আরও বলেন, “এখানে পুলিশের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তবে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে মামলার অভিযোগপত্র থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।”
এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান সমকালকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নাঙ্গলকোটে কিছু ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, পুলিশ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্কুলছাত্রসহ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। “তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে যথারীতি চার্জশিটে (অভিযোগপত্র) নাম আসবে না। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে মামলায় জড়ানো হচ্ছে না,” দাবি করেন পুলিশ সুপার।
