ফোরটিন ডেস্ক : দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগ, ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব না থাকা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ৭২টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১০৯। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ৬৫টি ঘটনায় ৮১ জন মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নামে উল্লেখ করা ২১১টি ঘটনার পরিসংখ্যানের সময়সীমা ও শ্রেণিবিভাগও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার সংখ্যা দেশের সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। সামাজিক চাপ, অনানুষ্ঠানিক সালিশ কিংবা ভয়ভীতির কারণে কোনো কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে না-ও আসতে পারে। তবে এসব অপ্রকাশিত ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
জাতীয় তথ্যভান্ডার ও স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা কেন জরুরি?
শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর তদারকি এবং অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতি কার্যকর করা, শিক্ষক নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই এবং অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের পর কোনো শিশুকে চুপ থাকতে চাপ দেওয়া, অনানুষ্ঠানিক সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।
সাভার ও বনশ্রীর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন
সাভারে সাত বছর বয়সী এক শিশুর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সাহায্য চাইতে গিয়ে উল্টো শিক্ষকের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার যে বিবরণ সামনে এসেছে, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বনশ্রীতে আবদুল্লাহ নামের এক শিশুকে ঘিরে ঘটনার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরও চার শিশুকে হয়রানির অভিযোগ ছিল বলে মূল লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা, পূর্ববর্তী অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং তদন্তের অগ্রগতি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ধরনের ঘটনায় কোনো অভিযোগ আগেই কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং শিশুটিকে সুরক্ষা দিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
অপরাধের বিচার হোক, ধর্মীয় বিতর্কের আড়ালে নয়
শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে। অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত, কিংবা তাঁকে নিয়ে কোনো ধর্মীয় বিতর্ক রয়েছে কি না, তা অপরাধের তদন্ত ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
কোনো ইসলামি সংগঠন বা ধর্মীয় বক্তা নির্দিষ্ট ঘটনায় কী অবস্থান নিয়েছেন, সে বিষয়ে সমালোচনা করতে হলে তাঁদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার তথ্য স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী না করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা মূল্যায়ন করা জরুরি।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ও আইনের সমান প্রয়োগ
ভালুকায় দীপু দাসকে ঘিরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, হামলা এবং তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে মূল লেখায় যে প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে, সেটিও আইনের সমান প্রয়োগের প্রশ্ন সামনে আনে। ঘটনার অভিযোগ, তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য এবং প্রমাণের অবস্থা নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠলেও তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, হামলা চালানো কিংবা হত্যা করার অনুমতি দেয় না। একইভাবে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগও সালিশ, সামাজিক চাপ বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানের অজুহাতে উপেক্ষা করা যায় না।
বিএনপি সরকার ও জামায়াতের কাছে জবাবদিহির দাবি
শিশু সুরক্ষায় জাতীয় তথ্যভান্ডার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও তদারকি, শিক্ষকদের অতীত যাচাই এবং স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের কাছে কার্যকর পদক্ষেপের ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছেও শিশু সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিয়ে তাদের অবস্থান এবং প্রস্তাবিত পদক্ষেপ জানতে চাওয়া যৌক্তিক।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তবে কী নীতি নেওয়া হয়েছে, কতটি অভিযোগ তদন্ত হয়েছে, কতটি ঘটনায় বিচার হয়েছে এবং শিশুদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে, সেসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
শিশুরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার হতে পারে না। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের। কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন অভিযোগ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিই হওয়া উচিত মূল অগ্রাধিকার।
ফোকাস কিওয়ার্ড: মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন, ছেলে শিশুদের যৌন সহিংসতা, জেএমবিএফ পরিসংখ্যান, আসক প্রতিবেদন, শিশু সুরক্ষা, মাদ্রাসার জবাবদিহি, স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা, বিএনপি সরকার, জামায়াতে ইসলামী, শিশুদের ন্যায়বিচার
