লেখকঃ কৃষিবিদ দীপু, পেশাজীবি ও কলামিস্ট
বাংলাদেশে এখন রাজনীতি নেই, আইনের শাসন নেই, বিচার নেই, আর মাঝেমধ্যে এমন কিছু দৃশ্যের অবতারণা ঘটে, যা দেখে মনে হয় রাষ্ট্রটা বুঝি বাস্তবতার মঞ্চ ছেড়ে সার্কাসের তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের হাতে পিস্তল, অন্য হাতে হ্যান্ডমাইক। তিনি একদল লোকের দিকে ছুটছেন, চিৎকার করছেন, তাড়া করছেন। দৃশ্যটি দেখে কারও মনে হতে পারে, তিনি বুঝি রবিনহুড! কারও মনে হতে পারে, বাংলাদেশের মাটিতে নতুন কোনো জেমস বন্ডের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কি সিনেমার পর্দা, আর মন্ত্রিত্ব কি অ্যাকশন ছবির প্রধান চরিত্র?
প্রতিমন্ত্রী নিজেই সেই অভিযানের ভিডিও নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন। প্রচারের ভাষায় মাদকবিরোধী অভিযান, বিক্রেতাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ। ভালো কথা। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি কী হবে? একজন মন্ত্রী কি নিজেই পিস্তল হাতে মাঠে নেমে যাবেন, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে বলবেন?
মাদক নির্মূলের নামে যদি মন্ত্রীকেই বন্দুক হাতে দৌড়াতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজটা কী? পুলিশ কি শুধু মন্ত্রীর হাতে ধরা পড়া আসামিকে গ্রহণ করার জন্য বসে আছে? পুলিশ কি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই? নাকি প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের আস্থার এতটাই অভাব যে মন্ত্রীদেরই এখন মাঠে নেমে পড়তে হচ্ছে?
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ। তাহলে তিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের ভিত্তিতে এভাবে অভিযানে নেতৃত্ব দিলেন? নাগরিক হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এক কথা, আর মন্ত্রী হিসেবে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর অস্ত্র বৈধ। ধরে নিলাম, অস্ত্রটির বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। কিন্তু অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই কি সেই অস্ত্র যেকোনো পরিস্থিতিতে, যেকোনো উদ্দেশ্যে প্রদর্শন বা ব্যবহার করার অবাধ অধিকার তৈরি হয়? আত্মরক্ষার জন্য বৈধ অস্ত্র রাখা আর জনসমক্ষে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। এখানে আইনগত প্রশ্ন আছে, নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির আশঙ্কাও আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন প্রদর্শনীর অভাব নেই। কেউ রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে ছবি তোলেন, কেউ অসহায় মানুষের হাতে সাহায্য তুলে দিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান, আর কেউ অপরাধী ধরতে গিয়ে নিজেই অ্যাকশন ছবির নায়ক হয়ে ওঠেন। এ যেন রঙ্গমঞ্চ।
মাদক ব্যবসার মূল হোতারা যদি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, আর মন্ত্রীকে পিস্তল হাতে ক্যামেরার সামনে অভিযান চালিয়ে বীরত্ব দেখাতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা শুধু মাদকের নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও গভীর গলদ আছে। বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? নাকি ছোটখাটো অভিযান, ক্যামেরার সামনে নাটকীয় উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারই এখন সরকারের সাফল্য প্রদর্শনের সবচেয়ে সহজ উপায়?
এই অভিযানের পর মাদক ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক কি ভেঙে পড়বে? রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা বড় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ, প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশ এবং ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে কি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ থাকবে? নাকি ক্যামেরার সামনে কয়েকটি অভিযান চালিয়েই জনগণকে বোঝানো হবে যে সরকার মাদক নির্মূলে সফল?
প্রধানমন্ত্রী ১৫০ টাকায় ডাল-ভাত-সবজি খেলেই যদি সেটি সরকারের বিরাট সাফল্য হয়ে যায়, বিমানবন্দরের লাউঞ্জে কম দামে খাবার কেনার দৃশ্য প্রচারই যদি জনদরদি হওয়ার প্রমাণ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের বাজারের হিসাব কে দেবে? দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস ও ওষুধের দাম দেখে দিশেহারা হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় বাড়ছে প্রতিদিন। অনেক পরিবারকে খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ কমাতে হচ্ছে, কেউ কেউ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। সেই বাস্তবতার পাশে ১৫০ টাকার একটি খাবারের প্রচার কতটা অর্থবহ? এটা নিশ্চিতভাবেই জনগণের কষ্টকে কয়েকটি সাজানো দৃশ্য দিয়ে ঢেকে দেওয়ার নাট্যমঞ্চ, তাই নয় কি?
এগারো শতাধিক শিশুর হামে মৃত্যুর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যদি জবাবদিহির প্রশ্ন ওঠে, সেই দায় নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু প্রতিরোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়? টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাঠপর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি, দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা-অসুবিধা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়।
চিকিৎসকের চেম্বারে সিগারেটের গন্ধ পাওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী যদি চিকিৎসককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন, অথচ জনস্বাস্থ্যের বড় সংকটে জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, তাহলে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের চেহারাটা কেমন দাঁড়ায়? একজন চিকিৎসক ধূমপান করেছেন কি না, সেটি অবশ্যই পেশাগত আচরণ ও স্বাস্থ্যনীতির আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে যদি হামে হাজারো শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালের অব্যবস্থা, ওষুধের সংকট, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, ভুয়া রিপোর্ট, নিম্নমানের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হয়, তাহলে ছোট একটি ঘটনাকে বড় করে দেখানো আর বড় সংকটকে আড়াল করার প্রবণতা হিসাবেই দেখবে জনগণ।
সরকারপ্রধানের রাজনীতিতে যদি প্রচারই বড় হয়ে ওঠে, অন্য মন্ত্রীরাও যে ক্যামেরার সামনে বীরত্ব দেখাতে উৎসাহিত হবেন, তাতে বিস্ময়ের কী আছে? একজন পিস্তল হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামছেন, আরেকজন হয়তো রাস্তা পরিদর্শনের সময় নাটকীয় ভঙ্গিতে নির্দেশ দিচ্ছেন, কেউ বাজারে গিয়ে দোকানদারের সঙ্গে দরদাম করছেন, কেউ সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছবি তুলে জনদরদি হওয়ার প্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু এসব দৃশ্যের আড়ালে দেশের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বেকারত্ব, দুর্নীতি, ব্যাংক খাতের দুরবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে গেলে লাভ কার?
অর্থনীতি যখন চাপে, বাজারদরে মানুষ দিশেহারা, জ্বালানি সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত, কৃষক যখন সার পায়না, তখন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার মতো বড় সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিদেশি অংশীদারদের সন্তুষ্ট করা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা, নিজেদের অবৈধ অসাংবিধানিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যে বোয়িং এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্ত তা জনগণের কাছে স্পষ্ট। জনগণ জানতে চায়, দেশের বর্তমান সামর্থ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিমান কেনার আগে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণের বোঝা, কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, যাত্রীসংখ্যা, রুটের লাভজনকতা এবং জাতীয় বিমান সংস্থার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা নিয়ে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা দরকার। যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর লোকসান করে, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ভোগে, অথচ নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগবে—এটি কি সত্যিই জাতীয় স্বার্থে, নাকি কোনো গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক সুবিধা ও অবৈধ অসাংবিধানিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রয়াস?
দেশের মানুষ যখন জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকটে ভুগছে, তখন জনগণের পকেট খালি করে বিলাসী ব্যয় এবং উচ্চমূল্যের ক্রয়চুক্তির আগে জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। উন্নয়ন দরকার, আধুনিকায়ন দরকার, আন্তর্জাতিক যোগাযোগও দরকার; কিন্তু উন্নয়নের নামে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের কর, মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণের মাধ্যমে বহন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মব সন্ত্রাস, লুটপাট, দখল, চাঁদাবাজি, যখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, রাষ্ট্র উগ্রবাদীদের অভয়ারণ্য, তখন সত্যিকার সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় না এনে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নিরপরাধ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে জনগণের কন্ঠরোধ করার প্রচেষ্টা সত্যিকার অপরাধীদের, আর বেশি বেপরোয়া করে তুলে। মাঝে মাঝে অভিযান, কয়েকটি লোকদেখানো গ্রেপ্তার করে অপরাধ দমন করা যায় না। অপরাধের পেছনে থাকা অর্থের উৎস, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কিংবা ক্ষমতাবান অপরাধী—পরিচয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধে আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আইন সত্যিই সবার জন্য সমান কিনা, এ নিয়ে যখন জনমনে প্রশ্ন জাগে, তখন সাধারণ মানুষ গর্জে উঠে, আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত হয়।
মানুষের ঘরে খাবার না থাকলে, চিকিৎসার সুযোগ না থাকলে, সন্তান নিরাপদ না থাকলে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এভাবে চলতে থাকলে গণবিস্ফোরণ নিশ্চিত।
আওয়ামী লীগ যখন প্রচার করে তাদের উন্নয়ন পদ্মা সেতুর কথা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কথা, মেট্রোরেলের কথা, বিদ্যুতে উৎপাদন বাড়ানোর কথা, কর্নফুলি টানেলের কথা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা, সামাজিক নিরাপত্তা মুলক বিভিন্ন ভাতা প্রদানের কথা, গরীব মেহনতী গৃহহীন মানুষদের জায়গা ও গৃহ প্রদানের কথা, তখন আপনাদের শো অফ এর অপরাজনীতি কতদিন টিকবে?
জনগণের “আগেই ভালো ছিলাম” বলা কতদিন মবসন্ত্রাসের করে বন্ধ করতে পারবেন?
ক্যামেরার সামনে শো অফ এর অপরাজনীতি সহজ, রাষ্ট্র চালানো কঠিন।
