ফোরটিন ডেস্ক : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় এক ভয়াবহ অধ্যায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সেই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
জার্মানিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বাবার মৃত্যুর খবর পান টেলিফোনে। পরিবারের একের পর এক সদস্য নিহত হওয়ার সংবাদে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দেশে ফেরার সুযোগও তখন ছিল না। নিরাপত্তার কারণে পরে তিনি ও তার বোন ভারতে আশ্রয় নেন এবং কয়েক বছর সেখানেই নির্বাসিত জীবন কাটান।
১৯৭৫-এর সেই হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তিনি সামনে আসেন। এর আগে ষাটের দশকের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। বাবার রাজনৈতিক জীবনে তার যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা সামরিক শাসনের সময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সক্রিয় হন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তাকে গৃহবন্দি ও গ্রেপ্তার করা হয় বলে ট্রান্সক্রিপ্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথচলা ছিল নানা সংঘাত ও প্রতিকূলতায় ভরা। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে তার নির্বাচনী কর্মসূচির সময় হামলার ঘটনা ঘটে। ট্রান্সক্রিপ্টে বলা হয়েছে, তার গাড়িতে বোমা রাখার ঘটনাও ঘটে এবং ওই হামলায় বহু মানুষ হতাহত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয় পায় এবং তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ওই সময় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় । তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারায় এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে।
এরপর ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও বহু মানুষ হতাহত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড় জয় পেয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং শেখ হাসিনা দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনা সরকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে। এ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংস আন্দোলনও দেখা দেয়। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে ২০১৩ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয় ।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও পরে দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আবারও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে নির্বাচন, অংশগ্রহণ, ভোটের পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যায়ে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা পায়।
২০০৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতিতে পরিণত হয় এবং দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, খাদ্য উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি ঘটে।
বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণিতে উঠে আসে এবং জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। পাশাপাশি মানব উন্নয়ন, শিক্ষা, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি ও অন্যান্য সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম ছিল ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে যাওয়ার দাবিও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ভিশন ২০৪১-এর আওতায় একটি উন্নত, প্রযুক্তিনির্ভর ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্য ও দারিদ্র্য কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে শুধু উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির আলোচনা নেই। রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, বিরোধী দলের ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দুই দেশের মধ্যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত যোগাযোগ এবং ভৌগোলিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি যোগাযোগ ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
আখাউড়া-আগরতলা রেল যোগাযোগ, খুলনা-মোংলা রেললাইন এবং রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পকে দুই দেশের সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের সুযোগও তৈরি হয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৩ সালে ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক গুরুত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকারের সামনে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও ছিল। কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা
সব মিলিয়ে, ১৯৭৫ সালের পারিবারিক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে নির্বাসন, দেশে প্রত্যাবর্তন, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিরোধী রাজনীতি, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
একদিকে তার সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্কও রয়েছে।
তাই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে মূল্যায়ন এখনও বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। ১৯৭৫-এর ট্র্যাজেডি থেকে শুরু হওয়া যে রাজনৈতিক যাত্রা তাকে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে রেখেছিল, সেই যাত্রার মধ্যেই দেশটির উন্নয়ন, রাজনৈতিক সংঘাত, কূটনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বহু অধ্যায় একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।
