নিজস্ব প্রতিবেদক
পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ও গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের বাধা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনের নিজ হাতে কবর খুঁড়ে দাফন সম্পন্ন করার অমানবিক ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জনপ্রিয় চিকিৎসক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ডা. তাসনিম জারা। তাঁর এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ডা. তাসনিম জারার ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী মারা যান। কিন্তু জামায়াত নেতাকর্মীরা মাইকে ও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে এবং মিছিল করে জানিয়ে দেন যে তাঁকে পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না। এমনকি তাঁকে গার্ড অব অনারও দিতে দেওয়া হবে না বলে তারা বাধা সৃষ্টি করেন।
পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল ছিল যে, পরিবারের পক্ষ থেকে বাড়িতে প্রথমে একটি কবর খোঁড়া হলেও কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। ভুক্তভোগী বৃদ্ধের মেয়ে সীমু আক্তার সাংবাদিকদের জানান, উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফুফুদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজেই নতুন কবর খুঁড়েন। ভয়ে বা আতঙ্কে পাড়ার কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। অবশেষে চরম উৎকণ্ঠার পর শনিবার গভীর রাতে পুলিশ পাহারায় মেয়ে ও বোনেদের খোঁড়া সেই কবরেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়; প্রশাসনের লোক ছাড়া পরিবারের বাইরে আর কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি তাঁর নিজ গ্রামে কোনো জানাজাও পড়তে দেওয়া হয়নি।
পোস্টে ডা. তাসনিম জারা উল্লেখ করেন, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি দাবি করেছিলেন যে মানিক পশারী ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’। কিন্তু মৃত ব্যক্তির মুক্তিযোদ্ধা হওয়া বা না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার ও যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রে আইনগত প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে। অথচ জামায়াতের নেতাকর্মীরা নিজেরাই বিচারক বনে গিয়ে দাফন ঠেকিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দাফনের পর সেই একই নেতা আবার বক্তব্য দিয়ে দাবি করেন যে ‘জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না’।
ডা. তাসনিম জারা ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে।”
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে যখন তাদের দিকে স্লোগান দেওয়া হতো, তখন তারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাত। অথচ আজ ক্ষমতা একটু হাতে আসতেই বা বিরোধী দলে থাকতেই তারা ঠিক একই ধরনের অসহিষ্ণু ও অমানবিক আচরণ অন্যদের সঙ্গে করছে।
ডা. তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে প্রশ্ন রেখে বলেন, নিজ দলের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে জামায়াত সবসময় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং মানবিক মর্যাদার কথা জোরালোভাবে বললেও সাধারণ মানুষের বেলায় কেন তার ঠিক উল্টো আচরণ দেখা যায়? ভোটের আগে ও বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বললেও একজন মৃত মানুষ ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ চরম অমানবিক। বিরোধী দলে থাকতেই যদি তারা সাধারণ মানুষের বসতভিটায় দাফন দিতে বাধা দেন, তবে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তাদের হাতে গেলে তারা কী করবেন—সেই শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
