নিজস্ব প্রতিনিধি: নোয়াখালীর হাতিয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রদলের এক নেতার গ্রামের বাড়িতে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী ছাত্রদল নেতার অভিযোগ, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের বিরুদ্ধে ‘৩ কোটি টাকার ডিল’ সংক্রান্ত অডিও-ভিডিও ফাঁসের জের ধরে এনসিপির নেতাকর্মীরা এই হামলা চালিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে নয়টার দিকে উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাগরিয়া বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এই হামলার পর রাতে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শত শত নেতাকর্মী রাজপথে নেমে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যা এলাকায় চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রদল নেতার নাম আবদুল গাফফার ওরফে জিসান। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য।
যেভাবে ‘কোটি টাকার ডিল’ বিতর্ক সামনে এলো
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ জুন। ওই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি চাঞ্চল্যকর পোস্টে গণ অধিকার পরিষদ থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া শীর্ষ নেতা রাশেদ খাঁন অভিযোগ তোলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুর্নীতির এক মহোৎসবে জড়িয়ে পড়েন এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ। আওয়ামী লীগের সাবেক এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যকে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিরাপদে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করতে চেয়েছিলেন তিনি। ছাত্রদল নেতা আবদুল গাফফার ওই সময় হান্নান মাসউদের সঙ্গেই থাকতেন। রাশেদ খাঁনের দাবি, আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকের পর আবদুল হান্নান মাসউদ স্বয়ং আবদুল গাফফারকে ডেকে বলেন, ‘ভাই, ওরা ১ কোটি দিতে চায়, আপনি ৩ কোটিতে ডিল করেন।’
রাশেদ খাঁনের দেওয়া এই বিস্ফোরক পোস্টটি ওই দিনই নিজের ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করে সত্যতা নিশ্চিত করেন ছাত্রদল নেতা আবদুল গাফফার। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হলে পাল্টা চাল চালেন সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ। তিনি তাঁর ফেসবুক আইডিতে গাফফারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় গাফফার তাঁর কাছে ‘মিথ্যা অভিযোগের’ জন্য ক্ষমা চাচ্ছেন।
তবে নাটকের এখানেই শেষ নয়; হান্নান মাসউদের এই পোস্টের কাউন্টারে আবদুল গাফফারের আরেকটি ভিডিও ফেসবুক লাইভে আপলোড করেন রাশেদ খাঁন। সেখানে গাফফার প্রকাশ্য দাবি করেন, “সান্ত্বনা দিতে ও পরিস্থিতি সামাল দিতেই আমি এমপি হান্নান মাসউদকে ফোন দিয়েছিলাম। তাঁর তিন কোটি টাকায় ডিল করতে চাওয়ার ঘটনাটি শতভাগ সত্য। তবে আমি অনৈতিক এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই লুণ্ঠনের ডিলটি সফল হয়নি।”
হামলা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে এই অডিও-ভিডিও ও কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁসের পর বৃহস্পতিবার রাতে একদল লোক লাঠিসোটা নিয়ে আবদুল গাফফারের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে এবং জানালার কাচ ভাঙচুর করে। এ সময় বাড়িতে থাকা জিসানের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার পর জিসান ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেন, “নোয়াখালী-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর কাছে হান্নান মাসউদের তিন কোটি টাকা চাঁদা চাওয়ার ঘটনাটি আমি প্রকাশ্যে আোনায় এনসিপির কর্মীরা আমার বাড়িতে হামলা করেছে। আমি ঢাকায় থাকি, বাড়িতে থাকেন আমার বৃদ্ধ বাবা-মা। কী দোষ ছিল আমার বাবা-মায়ের?”
তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এনসিপির হাতিয়া উপজেলা শাখার আহ্বায়ক মো. সামছু তিব্রিজ বলেন, “এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আসলে জিসান নিজেই ঢাকায় বসে এই হামলার নাটক সাজিয়েছেন নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য।” তিনি দাবি করেন, সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের অনুরোধেই তিনি রাতে ওই বাড়িতে গিয়ে সহমর্মিতা জানিয়ে এসেছেন।
সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সামনে সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। সেখানে আমাদের চাপে রাখার লক্ষ্যে, হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব নাটক করা হচ্ছে। তাঁর কথা সঠিক হলে তিনি ফোনে ক্ষমা চাইলেন কেন?”
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ছাত্রদল নেতা গাফফারের বাবা এ কে এম মোছলেহ উদ্দিনকে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
