এক যুগ আগেও চরম অর্থকষ্টে দিন কাটত পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর। কিন্তু গত এক দশকে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের মাধ্যমে আলাদিনের চেরাগ হাতে পান তিনি। গাড়িচালক থেকে রাতারাতি বনে যান অঢেল সম্পদের মালিক। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বোতলা গ্রামে গড়ে তোলেন আলিশান রাজপ্রাসাদ। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে রয়েছে তাঁর বিপুল সম্পত্তি। নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা দাবি করে তিনি ডাসার উপজেলা চেয়ারম্যান পদের প্রার্থী হিসেবেও ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
বছরের পর বছর ধরে পিএসসির (বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন) বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করে আসা কোটি কোটি কালো টাকায় আবেদ আলী তাঁর এই লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি আলোচিত এই মামলার ৪১ পৃষ্ঠার দীর্ঘ তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জশিটে প্রশ্নফাঁস চক্রের এই আদ্যোপান্ত ও চাঞ্চল্যকর তথ্যসমূহ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা এই মামলায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৮ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এই চার্জশিটে প্রশ্নফাঁস চক্রের মূলহোতা গাড়িচালক আবেদ আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত মোট ৫৫ সদস্যের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নাম ও পরিচয় উঠে এসেছে। এই চক্রে পিএসসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ছাত্র এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালচক্রের সদস্যরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
গ্রেফতার ৩৬ আসামি:
মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া ৩৬ জন আসামি হলেন—পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী, মো. নোমান সিদ্দিক, মো. খলিলুর রহমান, পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, এসএম আলমগীর কবীর, প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়, মো. জাহিদুল ইসলাম, পিএসসির উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু জাফর, মো. শাহাদত হোসেন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মামুনুর রশিদ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান, ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাইম হোসেন, ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী লিটন সরকার, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, মো. শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, ডিপক বণিক, মো. খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, মো. মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, মো. আসলাম হোসেন, কৌশিক দেবনাথ, মোজাহিদুল ইসলাম, মজনু মিয়া, ওয়াম্মদ আকরাম হোসেন, মো. আব্দুল আজিম, রূপন চন্দ্র দাস ও মাহামুদ হাসান মান্না।
পলাতক ১৯ আসামি:
চক্রের পলাতক ১৯ আসামি, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে, তারা হলেন—সুমন কুমার বসু, বিপাশ চাকমা, মো. দেলোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দিপু, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আল মামুন, মো. আনিছুর রহমান, মো. ওয়াসিম খান, মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফেরদৌস আহম্মদ, মো. মান্নান উদ্দিন, মো. আশরাফুল আলম, জাহিদুল সরদার, মো. সোহেল পারভেজ, মো. জুয়েল আল মামুন, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. রুবেল শরীফ, শাকের আহমেদ আল-আমিন এবং এম এম নাজমুল হাসান।
এছাড়া অপরাধে জড়িত থাকলেও পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় মো. গোলাম হামিদুল রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম ও আজাদ নামের ৪ জনের তথ্য অনুসন্ধানে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সাথে কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ।
যেভাবে চলত প্রশ্নফাঁসের ‘বুথ’ বাণিজ্য:
তদন্তে উঠে এসেছে, পিএসসির যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত ও চুক্তি করা পরীক্ষার্থীদের গোপন ডেরায় নিয়ে আসা হতো। বিজি প্রেস ও পিএসসির ভেতরের চক্রের মাধ্যমে পরীক্ষার মূল প্রশ্নসহ উত্তরপত্র আগেই ফাঁস করে সরবরাহ করা হতো। পরীক্ষার আগের রাতে প্রার্থীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে প্রশ্ন ও উত্তর সম্পূর্ণ মুখস্থ করানো হতো। এরপর পরীক্ষার দিন সকালে তাদের সরাসরি কেন্দ্রে পাঠানো হতো। বিনিময়ে প্রতি পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে আগাম ও চুক্তি অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকা বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নিত চক্রটি। এদের নেটওয়ার্ক বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি এনজিও পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সংঘবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থাকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং ধ্বংস করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩’-এর ১১ ও ১৫ ধারায় বিচার চাওয়া হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া চক্রের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের উৎস যাচাই এবং বিদেশে অর্থ পাচারের (Money Laundering) বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
