অনলাইন ডেস্ক: বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই আকস্মিক পাহাড় ধস ও টানা ভারী বর্ষণে ভেসে গেছে চট্টগ্রাম, পার্বত্য তিন জেলাসহ দেশের প্রায় অর্ধেক জনপদ। নদীর পানির উপচে পড়া ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে মারা গেছেন শতাধিক মানুষ; ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন ৫টি জেলার লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক। এই জাতীয় সংকটে যখন দেশের সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র-জনতা ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের সাধ্যমতো দুর্গতদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তখন এক অদ্ভূত নীরবতায় ডুবে আছেন দেশের নামজাদা ‘সুশীল সমাজ’ ও তাদের অবিসংবাদিত পথপ্রদর্শক, শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
দেশের অন্যতম শীর্ষ সুশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ড. ইউনূসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই চট্টগ্রামেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাঁর শিক্ষাকতা ও গবেষণার সূচনা, যার হাত ধরে জন্ম হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী গ্রীন ব্যাংকের। কিন্তু জন্মভূমির ইতিহাসসেরা এই মানবীয় ট্র্যাজেডিতে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদের পক্ষ থেকে সান্ত্বনার একটি বাণী বা বন্যাকবলিত মানুষের দিকে সহানুভূতির একটি হাতও প্রসারিত হতে দেখা যায়নি। সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল শেষে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর, নিজ জেলার বিপদে তাঁর এই চরম উদাসীনতা নাগরিক সমাজে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রথমত, ড. ইউনূস সবসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চট্টগ্রামকে তাঁর ‘আপন ঘর’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকাকালীন বহুবার চট্টগ্রাম সফর করে সেখানকার মানুষকে আপনজন বলে সম্বোধন করেছেন তিনি। অথচ আজ যখন সেই চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি ও গৃহহীন, তখন তিনি বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃশ্যমান কোনো ত্রাণ কার্যক্রম মাঠে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ যখন ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে, তখন ঢাকার কার্যালয়ে বসে নতুন নতুন প্রকল্পের গল্প তৈরি করা কতটুকু নৈতিক—তা নিয়ে সমালোচনা মুখর সচেতন মহল।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক মঞ্চে ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর’ কথা বলে নোবেল পুরস্কার পেলেও, গত দেড় বছরে দেশে অর্থনৈতিক সংকট ও নতুন করে দেড় কোটি মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার বাস্তবতায় ড. ইউনূসের সেই তত্ত্ব বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বন্যাদুর্গত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম থেকে নতুন করে নিজের আন্তরিকতা প্রমাণের বড় একটি সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। কিন্তু সংকটকালে তাঁর এই ভূমিকা প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের বস্তুগত পরিবর্তনের চেয়ে সুশীলদের আত্মপ্রচারই যেন বেশি প্রাধান্য পায়।
তৃতীয়ত, ‘সামাজিক ব্যবসা’ বা সোশ্যাল বিজনেসের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলা সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করলেও, দেশের প্রকৃত দুর্যোগে তাদের কার্যকর ভূমিকা সবসময়ই থাকে শূন্যের কোঠায়। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন—বাংলাদেশে উন্নয়নের ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত একশ্রেণীর সুশীল ব্যক্তিত্বরা সুশাসন ও মানবাধিকারের বার্তা ছড়িয়ে বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভর করে বিলাসী জীবন যাপন করেন। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের বাস্তব বিপদে, বন্যা বা মহামারীতে এই ‘জাতির বিবেকরা’ চিরকাল শীতনিদ্রায় চলে যান। চট্টগ্রামের চলমান এই মানবিক বিপর্যয় সুশীলদের দায়িত্ববোধ ও লোক দেখানো মানবসেবার আড়ালের প্রকৃত সত্যকে আবারও উন্মোচিত করে দিল।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
