আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্ট গার্ডের সদস্য পরিচয়ে সাধারণ এক জেলে মিরাজ শেখকে (৩০) তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ‘জোরপূর্বক গুমের প্রথম ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রতি নিখোঁজ মিরাজ শেখকে দ্রুত খুঁজে বের করা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গুমের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধে কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছে।
গতকাল রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এইচআরডব্লিউ তাদের এই উদ্বেগের কথা প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের মানবতাবিরোধী জোরপূর্বক গুমের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার প্রবল ঝুঁকি থেকেই যাবে। নিখোঁজ মিরাজ শেখের বাড়ি সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মণি গ্রামে।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১০ই এপ্রিল সন্ধ্যায় স্থানীয় এক চায়ের দোকান থেকে কোস্ট গার্ডের সদস্য পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি মিরাজকে আটক করেন। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম জানান, স্থানীয়দের মারফত খবর পেয়ে তিনি দ্রুত কোস্ট গার্ডের একটি পন্টুনে গিয়ে স্বামীকে আটকে থাকতে দেখেন। সেখানে কোস্ট গার্ডের পোশাক পরা ৮ থেকে ১০ জন এবং সাদা পোশাকের আরও বেশ কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এর প্রায় আধঘণ্টা পর মিরাজকে একটি দ্রুতগামী স্পিডবোটে করে হাড়বাড়িয়া ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন স্বজনরা দিগরাজ কার্যালয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ প্রথমে অভিযানের কথা বললেও বিকেলে জানায়—তারা মিরাজ নামে কাউকে আটক করেনি। এদিকে, যে দোকান থেকে তাকে তোলা হয়েছিল, সেখানকার মালিক এইচআরডব্লিউকে নিশ্চিত করেছেন যে, ঘটনার কয়েকদিন পর কোস্ট গার্ড পরিচয়ে এক ব্যক্তি এসে মিরাজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান এবং পরদিন তা আবার ফেরত দিয়ে যান।
পরবর্তীতে ২৩শে এপ্রিল মোংলা থানায় জিডি ও মে মাসে সংবাদ সম্মেলন করেও স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মিরাজের পরিবার। ওই রিটের শুনানি শেষে গত ১২ই জুলাই হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেন। এইচআরডব্লিউ আদালতের ওই মানবিক নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে শুরু থেকেই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে অস্বীকার করে আসছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অপারেশনস অফিসার স্পষ্ট জানিয়েছেন, মিরাজকে আটক করার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো দাপ্তরিক তথ্য বা সংশ্লিষ্টতা নেই।
এইচআরডব্লিউ-র এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এই বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, “মিরাজ শেখের গুম হওয়ার ঘটনাটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার ও আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে পুরোনো হিংস্র চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে ফিরে আসতে পারে।”
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের স্বাধীন তদন্তের যে বিশেষ আইনি ক্ষমতা দিয়েছিল, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সেটি নবায়ন না করে একটি নতুন আইনের প্রস্তাব এনেছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমের তদন্তভার পুনরায় পুলিশের হাতে রাখা এবং মানবাধিকার কমিশনের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সীমিত করার পরিকল্পনা জবাবদিহিতার পথকে দুর্বল করবে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
