দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পরও ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পুরনো চিত্র বদলায়নি। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল হান্নান মাসউদের জন্য একটি যাত্রীবাহী ফেরি নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রোববার রাতে হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে এই ঘটনা ঘটে। তীব্র ভ্যাপসা গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ফেরি আটকে রাখায় নারী ও শিশুসহ কয়েক শ যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী যাত্রী সূত্রে জানা যায়, গতকাল বিকেল সোয়া ৪টায় হরণী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ছেড়ে এসে বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে পৌঁছায় ফেরি ‘মহানন্দা’। নিয়ম অনুযায়ী, ফেরিটি খালি করে পুনরায় নতুন যাত্রী, যানবাহন ও পণ্য ওঠাতে সর্বোচ্চ সোয়া এক ঘণ্টা সময় লাগার কথা। সেই হিসাবে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ফেরিটি পুনরায় চেয়ারম্যান ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফেরিটি নলচিরা ঘাট ছাড়ে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পর, রাত পৌনে ৯টার দিকে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বিকেল থেকেই মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন গাড়ি পারাপারের জন্য টিকিট ও বুকিং নেওয়া হয়েছিল। তবে ঘাটে পৌঁছানোর পর ফেরিটি খালি করা হলেও রহস্যজনক কারণে বুকিং নেওয়া যানবাহনগুলো ভেতরে উঠতে দেওয়া হচ্ছিল না। দীর্ঘ সময় ফেরি না ছাড়ায় ঘাটে ও নদীর বুকে আটকে থাকা সাধারণ মানুষ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জসিম উদ্দিন নামে ফেরির এক ভুক্তভোগী যাত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, “নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও কেন ফেরি ছাড়া হচ্ছে না, তা আমরা ঘাট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তারা স্পষ্ট জানায়, ‘এমপি সাহেব আসবেন, তিনি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়া যাবে না।’ একজন জনপ্রতিনিধির জন্য এখানে কয়েক শ সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে কষ্ট দেওয়া হলো।”
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যথাসময়ে ফেরি না ছাড়ার কারণে তাঁরা ওপারে চেয়ারম্যান ঘাটে নেমে সোনাপুর বা জেলা শহর মাইজদী গিয়ে ঢাকাগামী রাতের দূরপাল্লার বাস ধরতে পারেননি। ফলে অনেক চাকরিজীবী ও রোগীকে বাধ্য হয়ে সারা রাত বাস কাউন্টারের মেঝেতে বসে কাটাতে হয়েছে।
এই বিষয়ে ফেরির মাস্টার মোজাম্মেল হক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে ফেরিটি নলচিরা ঘাটে পৌঁছায়। আনলোড ও লোডে সাধারণত ৪০ মিনিট করে সময় লাগে। কিন্তু আমাদের আগেভাগেই ওপর থেকে জানানো হয়েছিল, এমপি সাহেব আসবেন, তাই ফেরি ছাড়তে একটু দেরি হবে। এই কারণে আমরা শুরুতে সাধারণ গাড়িগুলো ওঠাতে দিইনি, যাতে যাত্রীরা কিছুটা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পরে রাত ৮টার পর আমরা চেয়ারম্যান ঘাটের উদ্দেশে রওনা দিই।” তবে ফেরি ছাড়তে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পৌনে এক ঘণ্টার মতো দেরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভিআইপি প্রটোকলের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তির এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, “একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে ঘাটে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ওই চক্রটি মোটরসাইকেল, ট্রাক, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন ফেরিতে না তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখে। এর ফলে ঘাটসংলগ্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকালও একইভাবে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলে বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় এবং ব্যর্থ প্রমাণ করা।”
সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ আরও বলেন, তিনি নির্দিষ্ট সময়েই ফেরিঘাটে পৌঁছেছিলেন এবং তাঁকেও ঘাটে পৌঁছানোর পর প্রায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই একটি পক্ষ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনমনে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে এমপির এই সাফাইতে শান্ত হতে পারছেন না সাধারণ ভুক্তভোগীরা; তাঁদের মতে প্রশাসনের এমন তোষামোদি ও ‘ভিআইপি কালচার’ বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের অধিকার কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।
