ছয় নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার পর এবার রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরেকটি ভয়ঙ্কর অনিয়ম সামনে এসেছে। ২০২৩ সাল থেকে ফায়ার সার্ভিসের কোনো বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স (ফায়ার সেফটি লাইসেন্স) ছাড়াই চলছে ৭০০ শয্যার এই নামী বেসরকারি হাসপাতালটি। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর একাধিকবার সতর্কবার্তা ও কড়া চিঠি দেওয়ার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা নবায়ন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি এবং কোনো অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনাও (ফায়ার সেফটি প্ল্যান) জমা দেয়নি।
গত বুধবার সকাল ৬টার পর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাসপাতালটিতে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, হাসপাতালের ডেলিভারি পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষের কোনো ধরনের কারিগরি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (AC) ব্যবস্থার ত্রুটি এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে জড়িত থাকতে পারে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত ছয় নবজাতকের মধ্যে দুজনকে ডেলিভারি পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ থেকে মৃত অবস্থায় নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়া হয়। বাকি চারজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় এনআইসিইউতে মারা যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যরা ওই পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষের ভেতরের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা এবং অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল বা ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে এই মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। বর্তমানে এই ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির পাশাপাশি রমনা থানা পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পৃথক তদন্ত চালাচ্ছে।
এই তদন্তের মাঝেই হাসপাতালের চরম গাফিলতির তথ্য দিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের সিনিয়র স্টাফ অফিসার শাহজাহান সিকদার জানান, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ২০২৩ সাল থেকে তাদের ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেনি। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাসপাতালটিকে বেশ কয়েকবার সতর্কীকরণ নোটিশ দেওয়া হলেও তারা তা পাত্তাই দেয়নি।
নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি জারি করা এক চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তিতে ফায়ার সার্ভিস স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, ‘অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩’ এবং ‘বাংলাদেশ জাতীয় ভবন কোড (BNBC) ২০২০’ অনুযায়ী, ৭০০ শয্যার এই হাসপাতালটি কোনো প্রকার অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড এবং জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দমকল বিভাগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তিন মাসের মধ্যে একটি ফায়ার সেফটি প্ল্যান প্রস্তুত করে তা বাস্তবায়ন করার আলটিমেটাম দিয়েছিল। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছিল যে, এটি মেনে চলতে ব্যর্থ হলে ভবনটিকে ‘ব্যবহারের অযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হতে পারে এবং আইন অনুযায়ী ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ ও কোম্পানি বিষয়ক পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি। তিনি অবহেলা আড়াল করার চেষ্টা করে বলেন, “আমার জানা মতে, আমাদের সব নথিপত্র হালনাগাদ করা হয়েছিল।” হাসপাতালটি গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তাদের কিছু নথি জমা দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মতে, হাজার হাজার নারী ও শিশুর চিকিৎসায় নিয়োজিত একটি বৃহৎ হাসপাতালে ফায়ার লাইসেন্স না থাকা এবং নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে যে, রোগীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে বাণিজ্যই এখানে মুখ্য।
