সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে কোনো পোস্ট না দেওয়ায় দেশের ২৫ জন বিশিষ্ট শিল্পী, অভিনেতা, শিক্ষক ও আইনজীবীকে ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ (সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদী) তকমা দেওয়া হয়েছে। একটি বিএনপিপন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠনের লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা এই বিতর্কিত ফটোকার্ডগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কার্ডগুলোতে ব্যবহৃত অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ভাষা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করার এই কট্টর প্রবণতা নিয়ে নেটদুনিয়ায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে।
যেভাবে ছড়ালো বিতর্কিত ফটোকার্ড
গত ৩১ মে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন থেকে ফেসবুক ও এক্স (সাবেক টুইটার) সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই ফটোকার্ডগুলো প্রচার করা শুরু হয়। কার্ডগুলোতে তালিকাভুক্ত সেলিব্রিটিদের অতীতে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে দেওয়া শোকবার্তার স্ক্রিনশট যুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তাঁরা কেন জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীতে একই ধরনের পোস্ট দেননি। পোস্ট না দেওয়াকে ‘রাজনৈতিক দ্বিচারিতা’ হিসেবে দাবি করে এই সাইবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
ফটোকার্ডের কুরুচিপূর্ণ ভাষা
ছড়িয়ে পড়া ওই ফটোকার্ডগুলোতে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় লেখা হয়েছে: “আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী। এইসব মাদারবোর্ডদের কি কোনো খবর আছে? যারা ১৫ আগস্ট আসলে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ লিখে পোস্ট দেয়।” পোস্টে আরও অভিযোগ করা হয়, “মূলত এরাই হচ্ছে কালচারাল ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারের দোসর। এইসব কালচারাল ফ্যাসিস্টদের কারণে হাসিনা সতেরো বছর ক্ষমতায় ছিল।” মূল পোস্টগুলোতে ব্যবহৃত অপভাষার তীব্রতার কারণে তা হুবহু প্রকাশ করার অযোগ্য।
তালিকায় আছেন যাঁরা
‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদী’ তকমা দিয়ে যে ২৫ জনের তালিকা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—দেশসেরা চলচ্চিত্র অভিনেতা শাকিব খান, দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান, মেহের আফরোজ শাওন, অভিনেতা সাজু খাদেম, জাহের আলভি, খায়রুল বাসার, স্বাধীন খসরু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন, তারকা আইনজীবী ও মডেল পিয়া জান্নাতুল, সমাজকর্মী ও চিকিৎসক আবদুন নূর তুষার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জ. ই. মামুনসহ আরও বেশ কয়েকজন সুপরিচিত মুখ।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় আঘাতের অভিযোগ
এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ নেটিজেন থেকে শুরু করে সংস্কৃতিকর্মীরা তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। প্রতিবাদকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য—কোনো ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত প্রোফাইলে কার জন্য শোক প্রকাশ করবেন বা করবেন না, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব স্বাধীনতা ও বিবেচনার বিষয়। কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন কাউকে জোর করে বা ব্ল্যাকমেইল করে শোকপ্রকাশের পোস্ট দিতে বাধ্য করতে পারে না। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে নাগরিকদের চিহ্নিত করে ‘তালিকা তৈরির নোংরা রাজনীতি’ নিজেই একটি চরম ফ্যাসিবাদী আচরণ।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মুক্ত মতপ্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এই ধরনের সাইবার ট্রলিং ও টার্গেটিং তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একটি দলীয় সংগঠনের ব্যানারে যদি স্বাধীন মত ও বিশ্বাসের কারণে দেশের প্রথম সারির নাগরিকদের প্রকাশ্য গালিগালাজ করা হয়, তবে তা সমাজে নতুন করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করবে। অতীতে যে ‘তালিকা সংস্কৃতি’ নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, নতুন মোড়কে আবারও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে কিনা—সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
এই চরম আপত্তিকর প্রচারণার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠনের কোনো কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও এই ফটোকার্ড বা তালিকা সংস্কৃতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া বা নিন্দা জানানো হয়নি।
