খোদ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরেই মিনি কারখানা গড়ে দেদারসে চলছে নকল টাকার প্রিন্টিং; ইয়াবা ও সোনা চোরাচালানে অবাধে ব্যবহার
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির এখন শুধু মাদকের অভয়ারণ্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনীতিকে ধ্বংস করার এক ভয়ঙ্কর ‘জাল নোটের সাম্রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশের গোপন কক্ষে গড়ে উঠেছে জাল টাকা তৈরির ছোট ছোট মিনি কারখানা। কম্পিউটার, স্ক্যানার আর কালার প্রিন্টারের বোতাম চাপলেই সেখানে দেদারসে বের হয়ে আসছে কড়কড়ে ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার জালনোট।
গত ২৪ মে টেকনাফের জাদিমোড়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসংলগ্ন একটি ভাড়া বাড়িতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অভিযান চালিয়ে ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ১০০ টাকার জাল নোট এবং এসব তৈরির বিপুল সরঞ্জামসহ একটি চক্রকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করার পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই চক্রের সাথে স্থানীয় এক এনজিও কর্মী এবং এক রোহিঙ্গা টমটমচালক জড়িত থাকলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সচেতন মহল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বছরের পর বছর ধরে চলা এই জঘন্য অপরাধের বিস্তার মূলত প্রশাসনের চরম গাফিলতি, দুর্বল গোয়েন্দা নজরদারি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার পরোক্ষ যোগসাজশেরই প্রমাণ। সীমান্তের কড়া পাহারা এবং ক্যাম্পের চারপাশের কাঁটাতারের বেড়া গলিয়ে কীভাবে জাল টাকা তৈরির আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ কাগজ ও কেমিক্যাল রোহিঙ্গা আস্তানায় পৌঁছাচ্ছে—তা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা এখন তীব্র প্রশ্নের মুখে।
হুন্ডি ও ইয়াবা চোরাচালানের প্রধান চালিকাশক্তি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত লাখ লাখ শরণার্থী বাংলাদেশি মুদ্রা সম্পর্কে ভালোভাবে পরিচিত না হওয়ায় জাল নোটের কারবারিরা সহজেই তাদের ফাঁদে ফেলছে। শুধু তাই নয়; মানবপাচার, সোনা কেনাবেচা, বিদেশ থেকে আসা অবৈধ হুন্ডির টাকা এবং সবচেয়ে বড় অপরাধ খাত ‘ইয়াবা চোরাচালানের’ প্রধান বিনিময় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এই জাল টাকা। মাদক মাফিয়ারা আসল টাকার বান্ডেলের ওপরে মাত্র কয়েকটি আসল নোট রেখে ভেতরে লাখ লাখ টাকার জাল নোট ঢুকিয়ে অবাধে লেনদেন করছে, যা দেশের মূল অর্থনৈতিক বাজারকে এক মহাসংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো নজরদারি নেই বললেই চলে।
ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশ ও প্রশাসনের উদাসীনতা
গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের অন্যতম সদস্য নাজমুল (২০), যার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল এলাকায়। সে গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারে এসে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে এই জাল নোট তৈরির কাজ করছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও তল্লাশির অভাবকে কাজে লাগিয়ে নাজমুল প্রতিদিন ‘ফেরিওয়ালার’ ছদ্মবেশে ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে জাল নোট সরবরাহ করত। প্রতিদিন ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে সে এই কাজ করত এবং ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে প্রতি মাসে নতুন নতুন ক্যাম্পের বাড়ি ভাড়া নিত। প্রশাসনের দীর্ঘদিনের উদাসীনতার কারণেই একজন সাধারণ ফেরিওয়ালা এত বড় জালিয়াত চক্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পেরেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নেপথ্যে এনজিও কর্মী ও ‘সমন্বয়ক’ সিন্ডিকেট
তদন্তে নেমে বিজিবি জানতে পেরেছে, এই জাল নোট কারখানার নেপথ্যে সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন জাদিমোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শিক্ষক ও একটি এনজিও-র কর্মী রশিদ আহমেদ। তিনি রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ানোর আড়ালে ‘আবু তাহের’ নামের এক কুখ্যাত রোহিঙ্গা জালনোট কারিগরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং নিজের টিনশেড ঘরের একটি কক্ষ ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কারখানা বানানোর জন্য ছেড়ে দেন। এই নোটগুলো ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিল রোহিঙ্গা টমটমচালক আজিজুর রহমান।
অভিযান চলাকালীন মূল হোতা আবু তাহের ও রশিদ আহমেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, যা নিয়ে স্থানীয়দের মনে নানা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, অভিযানের খবর আগে থেকেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মূল হোতারা সটকে পড়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ শব্দক অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু চুনোপুঁটি ধরে এই বৈশ্বিক ও জাতীয় অপরাধের শিকড় উপড়ানো সম্ভব নয়। সরকারের দুর্বল অভিবাসন নীতি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার কারণেই আজ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে জাল টাকার কারখানা বসানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে এই চক্র।
