নিজস্ব প্রতিবেদন : মাদ্রাসায় পড়তে আসা এক অবুঝ ও কোমলমতি শিশুর মুখে বারবার নিষ্ঠুরভাবে বেত ঢুকিয়ে নির্যাতন করছিলেন এক শিক্ষক। আর সেই পৈশাচিক নির্যাতনের দৃশ্য নিজের মোবাইলে ভিডিও করে ভিউ ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে নিজেই পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুধু তাই নয়, ভিডিওটির একটি চরম অসংবেদনশীল শিরোনাম দিয়ে তিনি লেখেন, ‘পিচ্চি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অমানবিক ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের একটি কওমি মাদ্রাসায়। অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের নাম ইমরান হোসেন, যিনি ওই মাদ্রাসার সাবেক সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায়। গত ১৬ জুলাই ভিডিওটি ফেসবুক ও টিকটকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এরপর তড়িঘড়ি করে ভিডিওটি মুছে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টটিই ডিলিট করে দেন ওই শিক্ষক। পরবর্তীতে তোপের মুখে পড়ে শনিবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দেশবাসীর কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চান।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কান্নারত এক শিশুশিক্ষার্থীর মুখের ভেতর বারবার বেত ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আতঙ্কে ও তীব্র যন্ত্রণায় শিশুটির কান্না আরও উথলে উঠছে। সে নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে বারবার বেতটি মুখ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আকুল চেষ্টা করলেও পাষণ্ড শিক্ষক তাতে বিন্দুমাত্র থামেননি।
মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মঞ্জুর আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক ইমরান হোসেন মূলত একজন উগ্র টিকটকার ছিলেন। শুরু থেকেই তাঁর আচরণে নানা অসংগতি লক্ষ্য করা গেছে। শিশুশিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশিক্ষকসুলভ আচরণ, অকারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদান এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে ভিউ কামানোর অভিযোগে তাঁকে প্রায় দুই মাস আগেই প্রতিষ্ঠান থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, চাকরি হারানোর পর ক্ষোভ থেকে তিনি পূর্বে ধারণ করা এই নির্যাতনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে মাদ্রাসাটি বন্ধ রয়েছে।
শনিবার এক ভিডিও বার্তায় অভিযুক্ত ইমরান হোসেন নিজের দোষ স্বীকার করে বলেন, ‘ভিডিওটি আমিই ধারণ করেছি এবং আমিই প্রকাশ করেছি। ছোট বাবুটি আমার কাছে পরীক্ষা দিতে এসেছিল। উত্তর দিতে না পেরে সে কান্না শুরু করলে আমি দুষ্টামি করে মুখে লাঠি ধরেছিলাম। আমি তাকে মারধর করিনি। বিষয়টি এভাবে দেখা হবে আমি ভাবিনি, আমার ভুল হয়েছে। আপনারা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’
এই বিষয়ে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘নৃশংস এই ভিডিওটি আমাদের নজরে আসার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, অভিযুক্ত শিক্ষককে দুই মাস আগেই মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি রায়পুর এলাকায় অবস্থান করছেন না। আমরা ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের সন্ধান করছি এবং জড়িত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবারকে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। অপরাধীকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।’
