নিজস্ব প্রতিবেদকঃ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন মব সন্ত্রাস, হামলা ও পুলিশি ধড়পাকড়ের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ৮২ বছর বয়সে এই বর্ষীয়ান নেতার মহাপ্রয়াণের পর তাঁর শেষ জানাজাকে ঘিরে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অস্থিতিশীলতার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা নিয়ে সচেতন নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাঙালির আবেগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ জানাজার আয়োজন করতে চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ধানমন্ডির একটি মসজিদে মরহুমের জানাজার আয়োজন করা হলে সেখানে অংশ নিতে আসা শোকাতুর নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় একদল উশৃঙ্খল যুবক। মাঠপর্যায়ে মব সন্ত্রাসের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে এই হামলা চালানো হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন। শুধু তাই নয়, জানাজার মাঠ ও এর আশপাশের এলাকা থেকে পুলিশ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে এবং ঢালাওভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটায়। মৃত একজন প্রবীণ ও জাতীয় নেতার জানাজাকে কেন্দ্র করে এমন নজিরবিহীন আচরণ ও বলপ্রয়োগের ঘটনাকে ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা।
অথচ তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রতিপক্ষের প্রতি রাজনৈতিক উদারতা ও সৌজন্যের এক অনন্য নজির ছিল। তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্ণ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক তীব্র মেরুকরণের মধ্যেও একবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোলার মাটিতে রাজনৈতিক সফরে গিয়েছিলেন। সেই খবর পেয়ে তোফায়েল আহমেদ নিজে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন মির্জা ফখরুলকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মতোই সর্বোচ্চ সম্মান ও আতিথেয়তা দেওয়া হয়। এমনকি তিনি নিজের বাসভবনেই মির্জা ফখরুলের থাকার সুব্যবস্থা করেছিলেন।
আজ সেই রাজনৈতিক উদারতার প্রতীক তোফায়েল আহমেদকেই জীবনের শেষ বিদায়টুকু শান্তিপূর্ণভাবে নিতে দেওয়া হলো না। ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের বিদায়লগ্নে এমন প্রতিহিংসামূলক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না দেশের মানুষ। সচেতন নেটিজেন ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যে মানুষটি জীবনের পুরোটা সময় দেশের স্বাধিকার ও জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, তাঁর কফিনে যারা আঘাত হানে এবং জানাজায় যারা মব সন্ত্রাস চালায়, ইতিহাস তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।
