নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের পাল্লায় যে জাতি পড়েছে সে জাতির মুক্তি নেই। এ জাতিকে উদ্ধার করতে হলে আগে সলিমুল্লাহ খানের মুখস্থ বিদ্যার হাত থেকে মুক্তি দিতে হবে।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের পাল্লায় যে জাতি পড়েছে সে জাতির মুক্তি নেই। এ জাতিকে উদ্ধার করতে হলে আগে সলিমুল্লাহ খানের মুখস্থ বিদ্যার হাত থেকে মুক্তি দিতে হবে।
জ্ঞান মানে অরিজিনালিটি, জ্ঞান মানে দাড়ি কমাসহ মুখস্থ করে কে কি লিখেছেন কেবল সেটা বলা নয়।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান নাকি বলেছেন, “চমস্কি ভাষার কিছুই জানে না।” আসুন আমরা জানার চেষ্টা করি নোয়াম (নো-আম/ নোম) চমস্কি ভাষার কিছু জানেন কি না।
সমকালীন ভাষাদর্শন এবং ভাষাতত্ত্বে (Philosophy of language and linguistics) চমস্কি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন দার্শনিক এবং তাঁর মৌলিক কন্ট্রিবিউশান আছে। আমি এখানে তিনটি আলাদা প্রেক্ষিতে তাঁর খুবই গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রিবিউশান নিয়ে কথা বলবো।
প্রাইভেট ল্যাঙ্গুয়েজ আরগুমেন্ট (ভাষা কি প্রাইভেট নাকি পাবলিক প্রপার্টি? প্রাইভেট ভাষা বলে আদৌ কিছু আছে কি না?) বিষয়ে ভিটগেনস্টাইন, ক্রিপকি এবং চমস্কিকে একটি ত্রিভুজ সম্পর্ক হিসেবে পড়ানো হয়।
Wittgenstein এর মতে, প্রাইভেট ভাষা বলে কিছু নেই। ভাষার অর্থ আসে সামাজিক ব্যবহার থেকে, community-র নিয়ম পালনের মধ্য দিয়ে। একা একা নিয়ম মানা সম্ভব নয়। কারণ “নিয়ম মানা” মানেই একটি সামাজিক মানদণ্ডের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানো। সুতরাং ভাষা মূলত পাবলিক প্রপার্টি।
Kripke তাঁর বিখ্যাত “Kripkenstein” পাঠে বা interpretation-এ দেখালেন, এমন কোনো fact নেই, (না মানসিক, না শারীরিক) যা নির্ধারণ করে আপনি “+” চিহ্ন দিয়ে quaddition না বুঝিয়ে addition বোঝাচ্ছেন। এই skeptical paradox-এর সমাধান আসে community থেকে। সমাজ যখন আপনার ব্যবহারকে সঠিক বলে স্বীকৃতি দেয়, তখনই অর্থ তৈরি হয়। এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে ক্রিপকি দেখান অর্থের ভিত্তি হিসেবে truth conditions (সত্য/মিথ্যা) নয়, বরং community-র স্বীকৃতি। আরো ভালোভাবে বললে, communal practice-এর মাধ্যমে অর্থের justification-কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ভিটগেনস্টাইন এবং ক্রিপকির মতে, ভাষা ও অর্থ মূলত সামাজিক বা পাবলিক প্রপার্টি।
এই প্রেক্ষাপটে Chomsky সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, “public language” বলে কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে সংজ্ঞায়িত বস্তু নেই; ভাষা মূলত একটি অভ্যন্তরীণ (internal) জৈবিক ব্যবস্থা, যাকে তিনি I-language বলেছেন। ফলে ভাষার প্রকৃতি সামাজিক নয়, বরং ব্যক্তি-নির্ভর ও মানসিক কাঠামোর অন্তর্গত।
এইভাবে Wittgenstein–Kripke ধারা ভাষাকে সামাজিক ও পাবলিক প্র্যাকটিস হিসেবে দেখলেও, Chomsky ভাষাকে একটি ব্যক্তিগত, অভ্যন্তরীণ কগনিটিভ সিস্টেম হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেন, যা দুই ধারার মধ্যে একটি মৌলিক দার্শনিক বিরোধ সৃষ্টি করে। সেই অর্থে ভাষা গভীরভাবে individual এবং internal।
W. V. O. Quine, Donald Davidson এবং Noam Chomsky-এই তিনজনের মধ্যে ভাষা ও অর্থ ব্যাখ্যা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য দেখা যায়। Quine তাঁর “radical translation” ধারণায় দেখান যে সম্পূর্ণ অচেনা ভাষা অনুবাদের ক্ষেত্রে একই আচরণগত ডেটা থেকে একাধিক সঠিক ব্যাখ্যা সম্ভব, ফলে অর্থ নির্ধারণে একটি মৌলিক অনির্ধার্যতা (indeterminacy) তৈরি হয়। Davidson এই ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে “radical interpretation”-এর মাধ্যমে বলেন, ভাষা বোঝা মানে হলো বক্তার বাক্যের truth-condition নির্ধারণ করা, যা পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণ ও যৌক্তিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
অন্যদিকে, Chomsky এই পুরো externalist ধারার সমালোচনা করে যুক্তি দেন যে ভাষার প্রকৃত বিষয় হলো মানুষের মস্তিষ্কে অবস্থিত একটি অভ্যন্তরীণ, জৈবিক ও গণনামূলক ব্যবস্থা, বা I-language, যা কেবল বাহ্যিক ব্যবহার বা interpretation দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ফলে Quine ও Davidson যেখানে ভাষাকে প্রধানত বাহ্যিক আচরণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন, সেখানে Chomsky ভাষাকে একটি অভ্যন্তরীণ কগনিটিভ সিস্টেম হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করেন।
সিমান্টিক নিহিলিজম নামে চমস্কির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব আছে যা ওয়েস্টার্নে সিমান্টিক্স প্র্যাগমেটিক্স ডিস্টিংশনের ক্ষেত্রে অবশ্য পাঠ্য।
ভাষার semantics–pragmatics বিভাজন বিষয়ে চমস্কি একটি প্রচলিত ধারা থেকে ভিন্ন ও প্রভাবশালী একটি অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি অর্থকে সরাসরি বাইরের জগতের রেফারেন্স (world-reference) দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রচলিত ধারণার প্রতি সংশয় প্রকাশ করেন এবং ভাষাকে মূলত একটি মানসিক গণনামূলক ব্যবস্থা (mental computational system) হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, ভাষার প্রকৃত অধ্যয়ন হওয়া উচিত মানুষের মস্তিষ্কে অবস্থিত অভ্যন্তরীণ কাঠামো, অর্থাৎ I-language নিয়ে, যেখানে বাক্য গঠন ও ব্যাখ্যা মানসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
চমস্কির এই দৃষ্টিভঙ্গি externalist meaning theories-এর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সমালোচনা তৈরি করে। কারণ externalist তত্ত্ব অর্থকে ভাষার বাইরের বস্তু, প্রেক্ষাপট বা সামাজিক ব্যবহারের সাথে সরাসরি যুক্ত করে। ফলে Chomsky-এর মতাদর্শ semantics–pragmatics পার্থক্যকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে, যেখানে অর্থকে শুধুমাত্র সামাজিক বা রেফারেনশিয়াল দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং কগনিটিভ ও অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কিছু দার্শনিক তাঁর এই অবস্থানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে “semantic nihilism” শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যদিও চমস্কি নিজে এই টার্মটি ব্যবহার করেননি।
তাহলে প্রথমত, ভাষা প্রাইভেট নাকি পাবলিক? দ্বিতীয়ত, র্যাডিক্যাল ট্রান্সলেশন বা ইন্টারপ্রিটেশন সম্ভব কিনা? তৃতীয়ত বাক্যের অর্থ কীভাবে নির্ধারিত হবে? এই তিনটি বিষয়ে চমস্কি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পড়া হয়। আমি সাধারণ পাঠকের বোঝার স্বার্থে সহজ করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।
জ্বি, “চমস্কি ভাষার কিছুই জানেন না।”
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাদর্শনে কি কন্ট্রিবিউশান আছে? কোন গবেষণা, রিসার্চ পেপার আছে কি? আমাদের জানানো হলে পড়ে সমৃদ্ধ হতে পারি।
তিনি একবার একটি একাডেমিক কনফারেন্সে বলেছিলেন বাংলাদেশের দার্শনিকগণ সব তৃতীয় শ্রেণির দর্শন চর্চা করেন। এই মন্তব্য করার পর কাল বিলম্ব না করে, কারো কোন কথা না শুনে তিনি জুম থেকে লিভ নিয়েছিলেন। অন্যকে আক্রমণ করার নেশা তাঁর আগে থেকেই।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান যদি Chomsky সম্পর্কে এমন মন্তব্য করে থাকেন, তাহলে তাঁর উচিত সেই মন্তব্যের একাডেমিক ভিত্তি স্পষ্ট করা। ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাদর্শনে তাঁর নিজস্ব গবেষণা, প্রকাশিত কাজ বা তাত্ত্বিক অবদান থাকলে তা আলোচনায় আনা যেতে পারে। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে কাউকে অস্বীকার করা একাডেমিক সমালোচনা নয়। একইভাবে, বাংলাদেশের দার্শনিকদের সামগ্রিকভাবে “তৃতীয় শ্রেণির দর্শনচর্চা” বলা হলেও সেটি প্রমাণসাপেক্ষ দাবি। একাডেমিক পরিসরে এমন sweeping claim করার আগে যুক্তি, উদাহরণ ও প্রমাণ দেওয়া প্রয়োজন।
কারও সঙ্গে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু একাডেমিক আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, যুক্তি ও প্রমাণই মুখ্য হওয়া উচিত। সুতরাং Chomsky-র মতো একজন বিশ্বমানের ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিককে অস্বীকার করতে হলে তা কৌতুক, বিদ্রূপ বা ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে নয়, বরং সুস্পষ্ট পাঠ, বিশ্লেষণ ও যুক্তির মাধ্যমে করতে হবে।
