নিজস্ব প্রতিনিধি :
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এক সময়ের ত্রাস সৃষ্টি করা বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসেই তিনজন এবং পরবর্তী সময়ে আরও তিনজন শীর্ষ সন্ত্রাসী মুক্তি পান। দীর্ঘ দুই দশক পর মুক্ত হয়েই তারা পুরোনো অপরাধ সাম্রাজ্য ও প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যার ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
তথ্যমতে, গত দেড় বছরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্বে অন্তত দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জোড়া খুন, চাঁদাবাজি, কুপিয়ে আহত করা এবং গুলি চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার শর্তে জামিন পেলেও এসব সন্ত্রাসীদের কেউই আর আদালতমুখো হননি। তাদের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে এবং যারা দেশে আছে তারাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে আত্মগোপনে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি ও হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা:
- ২০০১ সালের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে গত ২৮ এপ্রিল রাতে নিউমার্কেট সংলগ্ন বটতলা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
- টিটন ২০ বছর কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
- টিটন ছাড়াও ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন।
- কাছাকাছি সময়ে আরও ছাড়া পেয়েছেন শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, আব্বাস আলী ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু।
- টিটন হত্যার আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
- মামুন হত্যার পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্ব ও জামিনে থাকা সন্ত্রাসী ইমনের নাম উঠে আসে।
আধিপত্যের লড়াই ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ:
- ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি নিউ এলিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে মার্কেট দখল নিয়ে পিচ্চি হেলালের বড় ভাই ওয়াহেদুল হাসান দীপুকে কোপানোর ঘটনায় ইমনকে প্রধান আসামি করা হয়।
- একই বছরের সেপ্টেম্বরে রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনায় পিচ্চি হেলালের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
- টিটন হত্যাকাণ্ডে তাঁর ভাই বাদী হয়ে করা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলালের নাম উল্লেখ করেছেন।
- অন্যদিকে, পিচ্চি হেলাল গণমাধ্যমে দাবি করেছেন যে তিনি নির্দোষ এবং এই হত্যার জন্য টিটনের ভগ্নিপতি ইমনকে দায়ী করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞ মতামত: পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ৫ আগস্টের পর ছাড়া পেয়ে এসব সন্ত্রাসীরা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির অভাবই এই সিরিজ হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, জামিনে থাকা সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং অপরাধে জড়ালে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
