নিজস্ব প্রতিনিধি : কেরানীগঞ্জের আম্বিয়া খাতুন দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং গত তিন বছর ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্নার থেকে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা পেয়ে আসছিলেন । কিন্তু বর্তমানে সেখানে ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে; আগে এক মাসের ওষুধ পেলেও এখন ১০ থেকে ২০ দিনের বেশি ওষুধ মিলছে না, যা তাঁর মতো নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
আম্বিয়া খাতুনের মতো সারা দেশের ৪৪৬টি এনসিডি কর্নারে সেবা নেওয়া ১২ লাখেরও বেশি রোগী এখন নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না । নিবন্ধিত এসব রোগীর অধিকাংশ বয়োবৃদ্ধ ও দরিদ্র, যাদের বাইরে থেকে ওষুধ কেনার সক্ষমতা নেই । মূলত ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমটি এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছে ।
২০১৮ সালে সিলেটে প্রথম চালুর পর থেকে এনসিডি কর্নারগুলো উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছিল । শুরুতে রোগ নিয়ন্ত্রণের হার মাত্র ১৮ শতাংশ থাকলেও এই কর্মসূচির ফলে তা বেড়ে ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল । কিন্তু বর্তমান ওষুধ সংকটের কারণে এই অর্জিত সাফল্য ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং রোগীদের স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে ।
এনসিডি কর্নারগুলো মূলত মেটফরমিন, গ্লিক্লাজাইড এবং অ্যামলোডিপিনের মতো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সরবরাহ করে থাকে । স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফান্ডের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং হাসপাতালগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে কিছু ওষুধ কেনা হলেও তা চাহিদার তুলনায় সামান্য । ফলে রোগীদের এখন পূর্ণ মেয়াদের পরিবর্তে মাত্র কয়েক দিনের ওষুধ দিয়ে বিদায় করতে হচ্ছে ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া প্রায় ১০০ কোটি টাকার ওষুধ দিয়ে সর্বোচ্চ আগামী দুই মাস সেবা চালানো সম্ভব হতে পারে । নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বিশাল এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে । চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশই এখন অসংক্রামক রোগে ঘটে, যার একটি বড় অংশ হৃদরোগজনিত ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষকে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল । এখন ফান্ডের অভাবে এই কাজ থমকে গেলে তা হবে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম ব্যর্থতা । আগামী বাজেটে হাসপাতালের বরাদ্দ না বাড়ানো পর্যন্ত এই সংকটের টেকসই সমাধান মিলছে না, যা দরিদ্র রোগীদের জীবনকে আরও অসহায় করে তুলছে ।
