তিন স্বাগতিক দেশে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে শুরু হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ তথা ফিফা বিশ্বকাপ। গোটা বিশ্ব যখন ফুটবল উন্মাদনায় বুঁদ হতে প্রস্তুত, তখন ফুটবলপ্রেমীদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা হামলায় চরম বৈরী পরিস্থিতি এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সহস্রাধিক নিরীহ মানুষের মৃত্যুর পরও মাথা নত করেনি ইরান। বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ইরান এই বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের অনড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, এটি ফিফা বিশ্বকাপ, কোনো একক দেশের নয়। দেশের মর্যাদা, সম্মান ও দেশপ্রেম বিশ্বদরবারে তুলে ধরতেই প্রতিটি ম্যাচে জাতীয় সংগীত গেয়ে এবং পতাকা উড়িয়ে তারা মাঠে লড়াই করবে।
তবে আয়োজক দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে নজিরবিহীন ও অবিচারমূলক আচরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আগামী ১৬ জুন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মারাত্মক ভিসা জটিলতার কারণে উদ্বোধনী ম্যাচের মাত্র এক দিন আগে চার্টার্ড ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে ইরান দল। ইরানি ফুটবল ফেডারেশনের মুখপাত্র আমির মেহদি আলাভি জানান, ভিসা জটিলতার কারণে প্রথম ম্যাচের মাত্র একদিন আগে এবং পরবর্তী ম্যাচগুলোর দুই দিন আগে তারা ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন বৈরী আচরণের কারণে ইরানের এক ডজনেরও বেশি প্রশাসনিক ও ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা এবং সাধারণ সমর্থকেরা কোনো ভিসা পাননি। ফলে গ্যালারিতে থেকে দলকে সমর্থন দেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন ইরানি সমর্থকেরা।
ভিসার কঠোর শর্ত অনুযায়ী ইরানি দলকে ম্যাচের দিনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে এবং খেলা শেষেই দেশ ত্যাগ করতে হবে। এই প্রতিকূলতার কারণে ইরান তাদের মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অ্যারিজোনার পরিবর্তে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর টিজুয়ানাতে স্থাপন করেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই প্রথম এমন এক আসর হতে যাচ্ছে, যেখানে আয়োজক দেশ যুদ্ধাবস্থায় থাকা একটি দেশকে স্বাগত জানাচ্ছে। সমস্ত বাধা ও প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ইরানের এই বিশ্বকাপ যাত্রা বিশ্বজুড়ে খেলোয়াড় ও জনগণের দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের এই সাহসী সিদ্ধান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ইউনূস সরকারের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যোগ্যতা অর্জন করেও বাংলাদেশের না খেলার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।
তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ক্রিকেট বোর্ডের ওপর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। টাইগার পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার এক ঠুনকো অজুহাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বিশ্বকাপ বর্জন করতে বাধ্য করা হয়।
অনেকে মনে করেন, দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচাল করার একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। সস্তা ভারত বিরোধিতা উসকে দিয়ে দেশে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই ছিল এই হঠকারী সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আসিফ নজরুলের একগুঁয়েমি এবং ড. ইউনূসের নীরব সমর্থনের কারণে বোর্ড অসহায় হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর এক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের।
ইরান চরম বৈরিতার মধ্যেও শত্রুর দেশে গিয়ে খেলতে পারলে বাংলাদেশ কেন ভারতে খেলতে গেল না, এই প্রশ্ন এখন দেশের ক্রীড়ামোদিদের মুখে মুখে। সম্প্রতি দীর্ঘ একুশ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়া এই সম্ভাবনাময় দলটিকে বিশ্বকাপে অংশ নিতে না দেওয়াকে ক্রিকেটপ্রেমীরা বড় অপরাধ হিসেবে দেখছেন।
বিসিবির নবনির্বাচিত সভাপতি তামিম ইকবালও স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত দেশের ক্রিকেটের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন সরকারের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণ অনুসন্ধানে বিএনপি সরকার ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশপ্রেমের অজুহাতে এমন বহু দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি, দুর্নীতির নামে বেসরকারি খাতকে পঙ্গু করা এবং হামের টিকা কেলেঙ্কারি অন্যতম।
দেশের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল মনে করেন, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের সার্বিক কর্মকাণ্ড এবং দেশের কী কী ক্ষতি হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করতে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
