নিজস্ব প্রতিনিধি : সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধু টানেল নিয়ে নতুন করে নানামুখী আলোচনা ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এক বিবৃতিতে প্রেস সচিব দাবি করেন, বঙ্গবন্ধু টানেল মূলত একজন আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে যাতায়াতের সুবিধার্থে নির্মাণ করা হয়েছে এবং আগামী দশ বছরেও আনোয়ারায় কোনো ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
তৎকালীন সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই টানেলকে কেন্দ্র করে চীনের সাংহাইয়ের মতো ‛ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলের নগরায়ন গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মেগা প্রকল্প ‘বে টার্মিনাল’ নির্মাণ, আনোয়ারায় চীনা আদলে নতুন শহর স্থাপন এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোনের মাধ্যমে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বে টার্মিনালকে দেশের অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে অভিহিত করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের নৌ-পরিবহন হাব হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্যেই মূলত এর অবকাঠামোগত কাজ শুরু হয়।
প্রাথমিকভাবে ৪টি টার্মিনাল নিয়ে গঠিত হতে যাওয়া এই মেগা প্রকল্পে থাকবে একটি মাল্টি পারপাস টার্মিনাল, দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল এবং দ্রুত জ্বালানি খালাসের জন্য একটি স্বতন্ত্র তেল-গ্যাস টার্মিনাল। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারলেও বে টার্মিনালে সরাসরি ১২ মিটার গভীরতার বিশালাকার কন্টেইনারবাহী জাহাজ নোঙর করতে পারবে।
বে টার্মিনাল চালু হলে এর বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা দাঁড়াবে ৫০ লক্ষের বেশি, যা চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। সড়ক ও রেল সংযোগ সমৃদ্ধ এই হাবের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখে ইতিমধ্যেই সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটি, দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও আবুধাবি পোর্ট ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছে এবং বিশ্ব ব্যাংকও অর্থায়নে সম্মতি প্রকাশ করেছে।
বঙ্গবন্ধু টানেল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে চায়না ইকোনোমিক জোনের জন্য ৭৮৩ একর জায়গায় বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছে চায়না রোড এন্ড ব্রিজ করপোরেশন। সেখানে ৩৭১টি শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মিত হলে প্রায় দুই লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি টানেল থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে ২৪৯২ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠছে কোরিয়ান ইকোনোমিক জোন। ইতিমধ্যেই সেখানে ৪৮টি কারখানা চালু হয়েছে, যেখানে বর্তমান কর্মসংস্থান ৫০ হাজারেরও বেশি এবং টানেলের মূল সড়কের পাশে কাফকো ও সিইউএফএলের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান সচল রয়েছে।
শিল্প সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপ, ফোর এইচ গ্রুপ, ডায়মন্ড সিমেন্ট ও পারটেক্স গ্রুপ ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলে জমি ক্রয় করে কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চট্টগ্রাম চেম্বার ও উপজেলা প্রশাসনের সূত্রমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে গার্মেন্টস, ইস্পাত, সিমেন্ট ও জাহাজ নির্মাণসহ আরও অন্তত একশ নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
টানেলের এই সংযোগ সড়ক বাঁশখালী ও পেকুয়া হয়ে বহুল প্রতীক্ষিত এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের কারণে আনোয়ারা ও আশেপাশের অঞ্চলে জমির দাম প্রায় ১০ থেকে ১৫ গুণ এবং বাণিজ্যিক ভবনের ভাড়াও প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আধুনিক আবাসন সুবিধার জন্য ৯৫ একর জায়গায় কনভেনশন সেন্টার, হোটেল, হেলিপ্যাড ও ৩০টি রেস্ট হাউজ নিয়ে একটি বিশেষ সার্ভিস জোন গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া পারকি সমুদ্র সৈকতে পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে ৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্বমানের পর্যটন কমপ্লেক্সসহ বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
পতেঙ্গা, হালিশহর ও আনোয়ারা জুড়ে চলমান এই বিপুল লোকসমাগম এবং ভারী পণ্য পরিবহনের চাপ শুধু প্রচলিত শাহ আমানত সেতু দিয়ে সামাল দেওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। সেই বিবেচনায় উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে এই অঞ্চলে যাতায়াতকারী যাতায়াতকারীদের বিপুল কর্মঘণ্টা বাঁচাতে বঙ্গবন্ধু টানেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, তথ্য ও ফ্যাক্ট বিকৃত করে বর্তমান সরকারের মুখপাত্রের দেওয়া এমন বক্তব্য অনভিপ্রেত এবং তা স্থানীয় মেহনতি মানুষের সাথে এক ধরনের প্রতারণা। জনগণের আকাঙ্ক্ষার সংস্কার নিশ্চিত করতে এসে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর উপযোগিতা ও বৈচিত্র্যকে অবমূল্যায়ন না করে বরং ত্রুটি সংশোধন করে বাস্তবায়নে জোর দেওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
