নিজস্ব প্রতিনিধি
রাত হলেই লোডশেডিং, ভরসা তখন হালের চার্জার ফ্যান কিংবা প্রাচীনকালের হাতপাখা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ গ্রাম বা জেলা শহরের পরিস্থিতি এখন এমনই। অবশ্য বিদ্যুৎমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর এলাকার বাসিন্দা হলে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সে ক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে, আরামে ফ্যান বা এসি ছেড়ে যাবে ঘুমানো। যেমনটি পারছেন সিরাজগঞ্জের কিছু এলাকা আর যশোর সদরের বাসিন্দারা। কারণ, সৌভাগ্যবশত হোক বা কাকতালীয়— তারা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নির্বাচনী এলাকা বা সংসদীয় আসনের বাসিন্দা।
সিরাজগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১ ও ২ এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-২। এর মধ্যে জেলা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব নেসকোর।
এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ-১-এর আওতাভুক্ত গ্রাম আর উপজেলায় যখন লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ, তখন জেলা শহরে হচ্ছে নামমাত্র লোডশেডিং। সেখানে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বাড়ি। আবার যে উপজেলা পড়েছে তার নির্বাচনী এলাকায়, সেখানেও মাত্রা কম লোডশেডিংয়ের।
এটি নিছকই কাকতালীয় নাকি মন্ত্রীর এলাকার বাসিন্দারা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন, সেটি নিশ্চিত করে বলার নেই সুযোগ। যদিও কিছুদিন আগেও বিস্তর লোডশেডিংয়ের মধ্যে ছিল সিরাজগঞ্জ। এরই মধ্যে কৃষকসহ সিরাজগঞ্জের মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ চেয়ে মন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। বিষয়টি একটি ফেসবুক পোস্টেও তুলে ধরেছিলেন তিনি। এরপরই উন্নতি হয় জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহে।
জেলা বিএনপির এক নেতা আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন, এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে খোদ মন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন সাইদুর রহমান বাচ্চু। আর তাতেই দৃশ্যত এসেছে পরিবর্তন।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যেই দেশে বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষ করে, পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা রয়েছেন দুর্বিপাকে। সিরাজগঞ্জের মতো দেশের কোনো পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিই বিদ্যুৎ পাচ্ছে না চাহিদা অনুযায়ী।
এ জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ২৬৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, তাড়াশ ও রায়গঞ্জ— এ চার উপজেলা নিয়ে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ চাহিদা দিনে ১৪০ মেগাওয়াট কিন্তু সরবরাহ মিলছে ৮০-৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। ফলে উপজেলাগুলোয় গড়ে কমবেশি লোডশেডিং হচ্ছে তিন-চার ঘণ্টা।
অন্যদিকে বেলকুচি, কাজিপুর, কামারখন্দ ও সদর উপজেলার আংশিক নিয়ে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এ চাহিদা দিনে ৯৯ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে মিলছে ৮৫-৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। ফলে এসব উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে লোডশেডিং হচ্ছে কমবেশি দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা করে।
তবে ভিন্ন চিত্র সিরাজগঞ্জ শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠান নেসকোয়। কয়েক দিন আগেও নেসকো বিদ্যুৎ না পেলেও শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) থেকে পাচ্ছে চাহিদা অনুযায়ী। এর ফলে আপাতত শহরে লোডশেডিং নেই বললেই চলে।
নেসকো-২-এর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য বলছে, তাদের দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট; যার পুরোটাই পাওয়া যাচ্ছে এখন। অথচ শুক্রবারের আগেও পাওয়া যেত সর্বোচ্চ ১৭-২০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
জেলার কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানভেদে দিনে হচ্ছে দুই-চার ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং। বিশেষ করে, সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তা সবচেয়ে বেশি।
কয়েকজন গ্রামবাসী আগামীর সময়ের কাছে তুলে ধরলেন সন্ধ্যা নামলেই লোডশেডিংয়ে বিড়ম্বনার চিত্র। তাদেরই একজন ছায়েদুর রহমান। একরাশ হতাশা নিয়ে জানালেন দিনান্ত পরিশ্রমের পর রাতে একটু শান্তিমতো পারেন না ঘুমাতে— ‘আমরা তো শহরের মানুষের মতো এত রাত জাগি না। সারা দিন কাজ-কাম শেষে বেশিরভাগ মানুষই রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে শুয়ে পড়ি; কিন্তু এই সময়ডাই যেন কারেন্ট যাওয়ার সময়। একদিকে গরমে শুবের পারি না, অন্যদিকে ছায়াল-পাল ঠিকমতো পড়বেরও পারে না।’
লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করলেন সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল হুদা। জানালেন, দিনে ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাচ্ছেন ৮০-৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ— ‘আমাদের একেক ফিডারে বাই রোটেশনে (পালা করে) অন্তত দেড় ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিতেই হচ্ছে। ফলে প্রতিটি জায়গায়ই গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না।’
জেলার আরও চারটি উপজেলা নিয়ে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। যার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ জানালেন, তাদের প্রতিদিন দরকার ৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সেখানে মোটামুটি ৮৫-৯০ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার বড় অংশ পাওয়ার কারণে দিনে লোডশেডিং হচ্ছে না। তবে রাতে কিছু সময় লোডশেডিং দিতেই হচ্ছে।
এই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মধ্যে পড়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নির্বাচনী আসনের দুটি উপজেলার মধ্যে একটির পুরো অংশ ও আরেকটির আংশিক।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অশীথ পোদ্দার জানালেন, শুক্রবার থেকে চাহিদা অনুযায়ীই বিদ্যুৎ পাওয়ার তথ্য— ‘চাহিদা সময় অনুযায়ী পরিবর্তন হলেও আমাদের সিরাজগঞ্জের নেসকোর সর্বোচ্চ চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট; যার পুরোটাই আমরা পাচ্ছি। যার ফলে এখন আপাতত লোডশেডিং নেই বললেই চলে।’
বিশেষ কোনো নির্দেশনার কারণে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে নাকি চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়াটা স্বাভাবিক— সে প্রশ্ন ছিল তার কাছে। জবাবে এই প্রকৌশলী জানালেন, এটি তার কাছে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। অবশ্য তার ভাষ্যে উঠে আসে ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত— ‘আমাদের সাধারণত কখন লোডশেডিং করতে হবে, সেই তথ্যটা দেয় সিরাজগঞ্জ গ্রিড থেকে। তবে শুক্রবার থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে লোডশেডিংয়ের নেই কোনো নির্দেশনা।’
এর আগে চাহিদার চেয়ে আরও ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যেত বলে জানান তিনি।
প্রায় একই চিত্র যশোরেও। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নির্বাচনী আসন যশোর-৩ (সদর)-এ। সদর উপজেলার মানুষ পেলেও চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ পাচ্ছে না জেলার বাকি সাত উপজেলা।
যশোর সদর উপজেলা, অর্থাৎ শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)। ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন জানালেন, গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) যশোর শহরে ছিল না কোনো লোডশেডিং। কারণ, চাহিদা অনুযায়ী মিলেছিল বিদ্যুৎ। এরপর থেকেও যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে চাহিদার খুব বেশি ফারাক নেই। ফলে লোডশেডিং হলেও তা হচ্ছে সামান্যই।
যেমন, সোমবার (২০ এপ্রিল) বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬৫ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৬১ মেগাওয়াট। আগের দিন রবিবার (১৯ এপ্রিল) বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫৯ মেগাওয়াট, পাওয়া গেছে ৫৩ মেগাওয়াট। সদরে লোডশেডিং না থাকলেও যশোরের গ্রামগুলোয় লোডশেডিং নিয়েছে ভয়াবহ রূপ। দিনে গড়ে বিদ্যুৎ থাকে না প্রায় ছয় ঘণ্টা। ফলে সবচেয়ে উদ্বেগে আছেন বোরো চাষিরা।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ মনিরামপুর জোনাল অফিসের দেওয়া তথ্য বলছে, কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর— এ তিন উপজেলায় শুক্রবার মোট চাহিদা ছিল ১৬৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছিল ১০১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, যশোর সদরে যেদিন ৫২ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ হয় ৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎই, সেই একই দিন তিন উপজেলায় কম যায় ৬৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
এর পরের কয়েক দিনের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, শনিবার এ তিন উপজেলায় চাহিদা ছিল ১৬০ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয়েছিল ১০২ মেগাওয়াট। রবিবার চাহিদা ছিল ১৫০ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয়েছিল ১২৪ মেগাওয়াট।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহের এ বড় ঘাটতিই লোডশেডিংয়ের কারণ বলে জানালেন পল্লী বিদ্যুৎ-২-এর জেনারেল ম্যানেজার হাদিউজ্জামান।
বিদ্যুতের এ বিভ্রাট নিয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ উপজেলাগুলোর কৃষকরা। কেশবপুরের মেহেরপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম জানালেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ধানক্ষেতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দিতে পারছেন না। রাত জেগে করতে হয় অপেক্ষা। কখন বিদ্যুৎ আসবে আর কখন মোটর চালিয়ে জমিতে দেবেন পানি।
সন্ধ্যার পরপরই গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না বলে অভিযোগ কেশবপুর বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী পলাশের। তিনি বললেন, ‘গ্রামে বিদ্যুৎ থাকছে না বললেই চলে। সন্ধ্যার পরপরই চলে যায়, এরপর রাত ৯টা বা ১০টার দিকে আসে। ঘণ্টাখানেক থাকার পর আবারও চলে যায়। এই গরমে এলাকার মানুষকে ভীষণ কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।’
অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর এলাকা বলেই যশোর সদর উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে, এই দাবির পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু আট উপজেলার মধ্যে যখন সাতটিতেই বিদ্যুৎ থাকে না আর প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা থাকে আলো ঝলমলে; তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তপ্ত রোদে পুড়ে মাঠের ধান যখন শুকিয়ে কাঠ, তখন বোরো চাষির দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হচ্ছে বিদ্যুতের অভাবে। জেলা শহর আর গ্রামগুলো যখন দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই ভিন্ন দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের এলাকায়। অথচ দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ এখন শুধু একটি নাগরিক অধিকার নয়, বরং উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্তারা একে ‘কাকতালীয়’ দাবি করলেও অনেকেরই প্রশ্ন— যেখানে সারা দেশের মানুষ লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ, সেখানে মন্ত্রীদের এলাকায় কেন ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ জ্বলবে?
