নিজস্ব প্রতিনিধি : অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার সাড়ে তিন মাস পরও তাদের সময়কালের নানা সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে সাবেক উপদেষ্টাদের নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে হামে পাঁচ শতাধিক মায়ের বুক খালি হওয়ার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ এবং কুশপুত্তলিকা দাহের মতো ঘটনা ঘটছে।
কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও বিতর্কিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়ে মুখ খোলায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অধিকাংশ আলোচিত ও সরব উপদেষ্টা বর্তমানে অন্তরালে সময় পার করছেন এবং অনেকেই মব আতঙ্কে ভুগছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উপদেষ্টাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন এবং কেউ আবার আগের পেশায় ফিরলেও নিয়মিত অফিস করছেন না বা জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন। সাবেক এই সরকারের বিদায়ের পর তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবিও এখন বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান অন্তর্বর্তী আমলের দুর্নীতির তদন্ত দাবি করে বলেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে এই সরকার ৪টি জেনারেশন ধ্বংস করে দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ৩০ বছরের কম বয়সী উপদেষ্টারা দেশ-বিদেশে শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার আশ্বাস দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এর পরপরই সাবেক উপদেষ্টাদের বিদেশযাত্রা নতুন আলোচনার জন্ম দেয়, যার মধ্যে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সস্ত্রীক অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া সমালোচনা চলছে।
অবশ্য খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে অধিকাংশ সাবেক উপদেষ্টাই এখনো দেশেই অবস্থান করছেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গুলশানে তাঁর নিজস্ব বাসভবনে উঠে অসুস্থ স্ত্রীর সেবায় মন দিয়েছেন এবং পাশাপাশি তাঁর ‘থ্রি জিরো’ রূপকল্প ও সামাজিক ব্যবসা নিয়ে কাজ করছেন।
গত ২৭ মে ঈদের আগের দিন দীর্ঘদিনের সহকর্মী লামিয়া মোরশেদকে সাথে নিয়ে ফ্রান্সের প্যারিসের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন ড. ইউনূস। পরবর্তীতে নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা হিটলার ও তাঁর প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের শোবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন বলেও জানা গেছে।
সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করলেও বিস্ফোরক কিছু তথ্য সামনে এনেছেন। তিনি দাবি করেন, আনুষ্ঠানিক পরিষদের বাইরে ৭ সদস্যের একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল, যেখানে অন্য উপদেষ্টাদের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের কারণে তিনি অন্তত ৩ বার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।
সাবেক নৌপরিবহন ও শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বর্তমানে গবেষণা ও লেখালিখিতে সময় কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার নিজের প্রতিষ্ঠান উবিনীগে ফিরেছেন এবং মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে তা সংসদে আলোচনার দাবি জানাচ্ছেন।
লে. জে. (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং সাবেক খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বর্তমানে অলস সময় কাটানো ও লেখালিখির মধ্যে দিন পার করছেন। আলী ইমাম মজুমদারও গণমাধ্যমে ড. ইউনূসের সেই বিশেষ ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা মঙ্গলবারীয় বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ দীর্ঘদিন পর উত্তরার নিজের কর্মস্থল ‘ব্রতীর’ কার্যালয়ে গিয়ে সহকর্মীদের সাথে নিয়মিত বসার পরিকল্পনা করছেন। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দায়িত্ব শেষ করেই তাঁর পুরোনো কর্মস্থল ‘বেলা’-তে যোগ দিলেও বর্তমানে অসুস্থ খালার চিকিৎসায় হাসপাতালে ব্যস্ত রয়েছেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকেই অন্তরালে ছিলেন এবং সম্প্রতি স্ত্রী তিশাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর এই সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জবাবে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন যে, ভালো কাজের একটা কাফফারা দিতে হয় তবে মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডাই বলে দেয় তিনি তাঁর কাজ ঠিকমতো করতে পেরেছিলেন।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে গেছেন। অন্যদিকে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বারিধারার বাসায় বই লেখা ও ছবি আঁকার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন তাঁর নিজ ব্যবসা আকিজ-বশির গ্রুপে সময় দিচ্ছেন।
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে আছেন সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, যিনি দেশে হামের প্রকোপে শিশুমৃত্যু শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যত আত্মগোপনে আছেন। নিজের ফ্ল্যাটে বন্দি জীবন কাটানো এই উপদেষ্টা আপন আত্মীয় ও সহকর্মীদের থেকেও নিজের বর্তমান ঠিকানা লুকিয়ে রাখছেন এবং গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন।
শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান তাঁর পুরোনো এনজিও ‘অধিকার’-এ ফিরলেও প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না। তবে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান টেকনোক্র্যাট কোটায় নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরেছেন।
এ ছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আববার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা এ এফ এম খালিদ হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা দেশেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কর্মসূত্রে যুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
