মুহাম্মদ কাদের (Muhammad Kader) গ্রামের একজন সাধারণ ছেলে থেকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নেতা। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লগ্নসার গ্রামে ১৯৮৬ সালে জন্ম নেওয়া কাদেরের জীবনগল্প সংগ্রাম, অধ্যাবসায় এবং শিক্ষা শক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

শৈশবে বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাবিহীন পরিবেশে বেড়ে উঠলেও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস হারাননি তিনি। নিজের জীবন বদলানোর পাশাপাশি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার দৃঢ় সংকল্পই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় কাপাসতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর বিশ্বখ্যাত Harvard University-তে পড়ার সুযোগ পান, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশের পথ তৈরি করে।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি মালয়েশিয়ার একটি কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে গার্মেন্টস আমদানি ব্যবসা শুরু করেন এবং দ্রুতই দেশের বড় রিটেইল চেইনের সাথে কাজ করার সুযোগ পান। পরে তিনি নিজস্ব ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অফিস স্থাপন করেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়াচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী মুহাম্মদ এ. কাদের। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই ব্যবসায়ী একাধারে ওয়াল স্ট্রিট উদ্যোক্তা, সিভিল সোসাইটি নেতা এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী মহলে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০১৭ সালে ‘I Am Bangladesh’ -নামক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। এই উদ্যোগ বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৮ সালের মধ্যে তিনি ৩৫ টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করে ব্যবসা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ‘Rebuild Better Bangladesh Summit’ আয়োজন করে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। একই বছর নিউইয়র্কের মেয়র Eric Adams-এর হাতে বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী উপহার তুলে দেন, যা সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুহাম্মদ কাদের ২০১৭ ও ২০১৮ সালে জাতিসংঘ ইয়ুথ অ্যাসেম্বলিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া তিনি গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের হেলথকেয়ার কমিটির কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য, যার মধ্যে রয়েছে ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ, এশিয়া সোসাইটি এবং ইউএস প্যান এশিয়ান চেম্বার অব কমার্স।

তার অর্জনের তালিকাও দীর্ঘ। বাংলাদেশ সরকারের Commercially Important Person (CIP) সম্মাননা (সর্বকনিষ্ঠ প্রাপ্তদের একজন)। ২০২৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘Business Elite 40 Under 40’ সম্মাননা অর্জন করেন এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট Joe Biden-এর কাছ থেকে ‘Presidential Lifetime Achievement Award’ অর্জন করেন। National Healthcare Champion Award (USA)। নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি প্রোক্লেমেশন ও কংগ্রেশনাল রিকগনিশন। এছাড়াও বিভিন্ন কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সম্মাননায়ও ভূষিত হন তিনি।


তার প্রতিষ্ঠিত ‘পপুলার গ্রুপ’-এর মাধ্যমে তিনি বর্তমানে ৩৫টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যেখানে ১,২০০-র বেশি কর্মী কাজ করছে। স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, সফটওয়্যার, পোশাকশিল্পসহ নানা খাতে তার ব্যবসা বিস্তৃত।
বিশেষ করে তার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘All County Healthcare Group’ হোম কেয়ার ও ডে কেয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সিনিয়র কেয়ার উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশে ছয়টি নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা (NCLEX) পাস করে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতে কাজ করতে পারে।
নিউইয়র্কে বাঙালী স্বাদ, স্বাস্থ্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন নবান্ন রেস্টুরেন্ট তারই উদ্যোগ। মুহাম্মদ কাদেরের ঢাকাইয়া খাবারের প্রতি রয়েছে গভীর আবেগ। কাদেরের সেই আবেগ থেকেই ঘরোয়া রান্নার স্বাদ, ঢাকাইয়া ঐতিহ্য ও পুষ্টিগুণকে একত্রে উপস্থাপন করছে নবান্ন রেস্টুরেন্ট। এছাড়া নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি ভিনদেশি অতিথিদের কাছেও বাংলাদেশি খাবারের আসল স্বাদ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নবান্ন রেস্টুরেন্ট নিয়মিতভাবে সেবার মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান মুহাম্মদ কাদের। নবান্ন রেস্টুরেন্ট আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ও স্বনামধন্য বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট, যেখানে রয়েছে আসল বাংলাদেশি খাবার, ক্যাটারিং সার্ভিস ও আধুনিক পার্টি হল। সুস্বাদু খাবার, দক্ষ শেফ ও চমৎকার সার্ভিসের জন্য নবান্ন বিশেষভাবে প্রশংসিত।
মুহাম্মদ কাদের প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘বেঙ্গল ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়ন’ নামে ব্যাংকের অনুমোদন লাভ করেন। এটি তার নেতৃত্বে তিনশোর বেশি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে কার্যক্রম। এই উদ্যোগটি জাতীয় ক্রেডিট ইউনিয়ন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NCUA)-এর সকল নিয়ম মেনে, শুধুমাত্র সদস্যদের তহবিলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
পারিবারিক মূল্যবোধ তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাবা-মা সহ পরিবারের অনুপ্রেরণাই তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। স্ত্রী সিফা ভূঁইয়া ও কন্যা কেলি কাদের তাঁর জীবনের শক্তি ও প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু।
একজন গ্রামবাংলার সাধারণ ছেলে থেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে দৃঢ় সংকল্প, শিক্ষা এবং স্বপ্ন থাকলে অসম্ভব নয় কিছুই।
