নিজস্ব প্রতিবেদকঃ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে সম্প্রতি দেওয়া এমন একটি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত ঘোষণাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া তীব্র বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক দূর করার চেষ্টা করেছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস)।
গত শুক্রবার (২৯ মে) এক জরুরি ব্যাখ্যায় বিভাগটি জানায়, অভিবাসন নীতিতে ঢালাও বা বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে নির্দিষ্ট কিছু গুরুতর খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে গ্রিন কার্ডপ্রত্যাশীদের যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে গিয়েই চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল গত সপ্তাহে, যখন ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে এবং কেবল ‘বিশেষ’ বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই তারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবেন। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ (যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই গ্রিন কার্ডের আবেদন ও অপেক্ষা করার প্রক্রিয়া) ব্যবস্থার বিপরীতে এই আকস্মিক ঘোষণা মার্কিন অভিবাসী ও আইনি মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ফলে শুক্রবার ডিএইচএসের এই নতুন ব্যাখ্যাকে অনেকেই মার্কিন প্রশাসনের আংশিক পিছু হটা বা অবস্থান নরম করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
ডিএইচএস স্পষ্ট করেছে যে, একজন আবেদনকারীকে গ্রিন কার্ডের জন্য আমেরিকার বাইরে যেতে বাধ্য করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার ‘কেস-বাই-কেস’ (ঘটনাভেদে) সিদ্ধান্তের ওপর। মূলত যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান করছেন (ওভারস্টে) কিংবা যেসব দেশের নাগরিকরা মার্কিন সরকারি সামাজিক সুবিধা তুলনামূলক অধিক ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই কড়াকড়ি আরোপ হতে পারে।
তবে এই নতুন ব্যাখ্যাতেও প্রবাসীদের ভয় বা উদ্বেগ কমছে না। কারণ, ঠিক কারা এবং কীভাবে প্রভাবিত হবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে মার্কিন ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই ইন্টারভিউ বোর্ডে কর্মকর্তাদের অনেকে মক্কেলদের জিজ্ঞাসা করেছেন যে তারা কেন নিজ দেশে ফিরে গিয়ে গ্রিন কার্ডের আবেদন করছেন না।
সাবেক ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা ও থার্ড ওয়ের সামাজিক নীতিবিষয়ক প্রধান সারাহ পিয়ার্স এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, “মানুষের তীব্র ক্ষোভের কারণেই প্রশাসন বাধ্য হয়ে নিজেদের তৈরি করা জট পাকাতে মাঠে নেমেছে।” তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রশাসনের অভিবাসন নীতির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দূরদর্শিতার চেয়ে হঠাৎ চমকে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি করা।
আমেরিকান ইমিগ্রেশন লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক বেঞ্জামিন জনসন জানান, সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে এই নীতির বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর আইনি পদক্ষেপ বা মামলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন ব্যবসায়িক সংগঠন ইউএস চেম্বার অব কমার্স সতর্ক করেছে যে, এই অস্পষ্ট নীতি মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নিয়োগকর্তাদের জন্য চরম বিপর্যয়কর হতে পারে। বিশেষ করে এইচ-১বি (H-1B) ভিসায় থাকা হাজার হাজার উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রযুক্তি কর্মী—যারা বছরের পর বছর ধরে গ্রিন কার্ডের লাইনে আছেন, তারা এখন গভীর সংকটে পড়বেন।
পারিবারিক স্পনসরে আবেদনকারীদের ওপর এর প্রভাব হবে সবচেয়ে মারাত্মক। বাইডেন প্রশাসনের সময়কার ইউএসসিআইএস জ্যোষ্ঠ কর্মকর্তা ডগ র্যান্ড বলেন, “তারা মূলত এই জায়গাটাতেই আঘাত করতে চেয়েছেন। যদি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া কোনো অভিবাসীকে গ্রিন কার্ডের জন্য নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে তিনি কার্যত ফাঁদে পড়ে যাবেন। কারণ মার্কিন আইন অনুযায়ী, তাকে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।”
বাস্তবতা হলো, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৪ লাখ গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৮ লাখ ২০ হাজারই সম্পন্ন হয়েছিল দেশটিতে অবস্থানকালীন ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে দেখা এই বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে তীব্র প্যানিক বা আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার ফলে মার্কিন শ্রমবাজারে বিদেশি প্রতিভাবানদের আগ্রহ নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করেছে।
