নিজস্ব প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর (৬৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাকে ঘিরে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং ঘটনার গুরুত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (১৩ এপ্রিল) রাতে নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে উপজেলা জামায়াতের রোকন খাজা আহম্মেদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ, স্থানীয় জামায়াত কর্মী রাজিব দফাদার মিস্ত্রি এবং একটি মাদ্রাসার শিক্ষক শিহাব।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ১১ এপ্রিল দুপুরে, যখন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি পুরনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে ফিলিপনগরের ‘কালান্দার বাবা শ্রী শামীম জাহাঙ্গীর দরবার শরীফে’ হামলা চালায় একদল বিক্ষুব্ধ জনতা। হামলার সময় শামীম জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং আস্তানায় ভাঙচুর চালানো হয়।
তবে এ ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতারা দাবি করেছেন, এটি একটি গণপিটুনির ঘটনা এবং এতে রাজনৈতিক দল বিএনপির সম্পৃক্ততা রয়েছে। উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন মামলাটিকে “রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত” হতে পারে বলে উল্লেখ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মামলার প্রধান আসামি খাজা আহম্মেদ নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন তিনি বরং পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হামলার খবর পেয়ে তিনি নিহতের পরিবারকে সতর্ক করেছিলেন এবং পরে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরিবর্তে হাসপাতালে যেতে বলা হয়।
খাজা আহম্মেদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সভাপতি, সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ কিছু নেতা এই ঘটনার সাথে জড়িত। তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাকে মামলায় জড়িয়েছেন। “আমি চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে এলাকায় কাজ করছি। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে আমাকে এই ঘটনায় জড়ানো হয়েছে,” বলেন তিনি।
একই মামলার আরেক আসামি খেলাফত মজলিস নেতা আসাদুজ্জামান আসাদও নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “হামলা ঠেকাতে সেদিন বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”
এদিকে, বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, জামায়াত ইসলামীর নেতারা এই ঘটনার সাথে জড়িত। তারা উগ্র মৌলবাদি চর্চার ধারাবাহিকতায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মাজারে হামলা করে পীরকে হত্যা করেছে।
তবে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ঘটনাটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততায় ঘটেছে। তাদের মতে, শুধু এক পক্ষকে দায়ী করলে প্রকৃত ঘটনা আড়াল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনায় রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে এবং প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
তারা আরও মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মব সহিংসতা, গণপিটুনি ও ধর্মীয় উসকানিমূলক ঘটনার প্রবণতা বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া এ ধরনের সহিংসতার ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দৌলতপুরের এ হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। এজন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
