নিজস্ব প্রতিনিধি
বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপি নেতা গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের মালিকানাধীন ‘এসআর কেমিক্যাল’ কারখানার বিষাক্ত গ্রাসে বিলীন হতে চলেছে ‘রাজাপুর’ নামের একটি সাজানো জনপদ। পরিবেশ বিধ্বংসী এই দানবীয় কারখানার বর্জ্যে পুরো এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি এখন বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত। মাঠের ফসল পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। গাছপালা মরে কঙ্কালসার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের যে চিত্র ইতিহাসে দেখা যায়, রাজাপুরের বর্তমান অবস্থা তার চেয়েও ভয়াবহ
অভিযোগ উঠেছে, এসআর কেমিক্যাল কারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি মিশছে করতোয়া, ফুলজোড়, বাঙালি ও ইছামতী নদীতে। এর ফলে এই নদীগুলোর সমস্ত জীবজগত ও মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। রাজাপুরের কৃষিজমিতে এখন আর কোনো ফসল ফলে না। মাটির গভীরে কেমিক্যাল প্রবেশ করায় টিউবওয়েলের পানি পান করা তো দূরে থাক, ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এমপি সিরাজ পুরো এলাকার পানির উৎস ধ্বংস করে দেওয়ার পর এমপি জিএম সিরাজ এখন পাইপলাইনের মাধ্যমে দুই-পাঁচ লিটার পানি সরবরাহ করে ‘মানবতার নাটক’ করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়রা বলছেন, “যিনি আমাদের হাজার হাজার একর জমি আর পানি বিষাক্ত করলেন, তিনি এখন নামমাত্র পানি দিয়ে তামাশা করছেন।”
সম্প্রতি সয়সাল বিশ্বাস নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাজাপুরের এই বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরে একটি ভিডিও প্রকাশ করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, জনপদটি কীভাবে একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
ভিডিওর নিচে মোঃ সামিউল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, এখন বর্তমান ক্ষমতাধরেরা একই পথে হাঁটছে। সত্য তুলে ধরায় আপনার জীবন বিপন্ন হতে পারে। এই রাক্ষসদের পেট ভরে না।
আবু রায়হান নামের একজন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে লিখেছেন, এই কোম্পানির প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া আছে।
আবার আল ইমরান নামের এক নেটিজেন আশঙ্কার সুরে লিখেছেন, দানবের বিরুদ্ধে লাগতে গেলে ভয়ংকর পরিণতি হবে। এই দানবরাই এখন ক্ষমতায়।
হুমকির মুখে প্রতিবাদী কণ্ঠ রাজাপুরের পরিবেশ রক্ষা ও এই ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে কথা বলায় অনেককেই হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি খোদ সয়সাল বিশ্বাসকেও সাবধানে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা। অভিযোগ আছে, এমপি সিরাজের ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় প্রশাসনও এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এবং পরিবেশবাদীরা রাজাপুরকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং জলবায়ু কর্মীদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা বলছেন, এখনই যদি এই ‘পরিবেশ ঘাতক’ কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে মানচিত্র থেকে রাজাপুর নামের জনপদটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত বাংলাদেশে একজন জনপ্রতিনিধির হাত ধরে একটি পুরো জনপদ ধ্বংস হওয়ার এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—এ কোন দেশে আমরা বাস করছি? যেখানে সত্য বলাই এখন সবচেয়ে বড় পাপ।
