নিজস্ব প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের ভালুকায় চাঞ্চল্যকর দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান আসামি মো. মাসুম উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ার পরও মাত্র কয়েক মাসের মাথায় এই আসামির জামিন পাওয়ায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন এবং বিচারব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ০৬ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ এবং বিচারপতি সৈয়দ হাসান জোবায়ের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ আসামি মাসুমকে এক বছরের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। আদালতের জামিননামা ১৩ এপ্রিল ময়মনসিংহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে কার্যকর হয়। মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার মো. চাঁন মিয়া খালাসীর ছেলে মাসুমের পক্ষে দুই হাজার টাকার মুচলেকায় এই জামিননামা গৃহীত হয়।
গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ভালুকার একটি ফ্যাক্টরিতে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা ও উসকানিমূলক অভিযোগ তুলে দিপু চন্দ্র দাসকে বর্বরোচিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘাতকরা কেবল তাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, পরবর্তীতে তার মরদেহ পুড়িয়ে ফেলে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা চালায়। এই ঘটনায় ভালুকা মডেল থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারাসহ একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
ক্ষুব্ধ পুলিশ ও স্বজনরা বর্তমানে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত করছে। পুলিশ জানায়, মাসুমসহ এ পর্যন্ত ২৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বয়ং মাসুম এই হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন।
এমন একজন দুর্ধর্ষ ও স্বীকারোক্তি দেওয়া আসামি এত দ্রুত জামিন পাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, মাসের পর মাস অভিযান চালিয়ে যাদের ধরা হয়েছে, তারা যদি আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এভাবে বেরিয়ে যায়, তবে অন্য আসামিরাও একই পথে হাঁটবে। এতে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিহত দিপুর ভাই অপু রবি দাস কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেওয়া খুনি যদি কয়েকদিন পরই বীরদর্পে জেল থেকে বেরিয়ে আসে, তবে আমরা সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার চাইব? আমরা কি সংখ্যালঘু বলেই এই অবিচার?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমান বিএনপি ও জামায়াত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর কিছু মহলের অযাচিত প্রভাবের কারণে স্পর্শকাতর মামলাগুলোতেও আসামিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
ভিকটিম পরিবার ও সচেতন মহল এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে দ্রুত আপিল করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
