নিজস্ব প্রতিনিধি
বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিনাশী এবং মৃত্যুঞ্জয়ী নাম শেখ হাসিনা। যার জীবন এক ধ্বংস না হওয়া মহাকাব্য। বারবার ঘাতকের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছেন পৌরাণিক ফিনিক্স পাখির মতো। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এক পরিকল্পিত অরাজকতা ও উগ্রবাদের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে অপচেষ্টা হয়েছে, তা ছিল ১৯৭১ এবং ১৯৭৫-এর পরাজিত শক্তির এক ভয়াবহ নীল নকশা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শেখ হাসিনাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব; তিনি বারবার ফিরে আসেন জনগণের মুক্তির দূত হয়ে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ের তথাকথিত আন্দোলনকারীদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা তাকে সপরিবারে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং লক্ষ কোটি মানুষের দোয়ায় তিনি আবারও বেঁচে যান। সেই থেকে শুরু হয়েছে তার ওপর নজিরবিহীন মানসিক ও আইনি নিপীড়ন।
বর্তমানে তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক ভিত্তিহীন হত্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বরেণ্য জননেত্রীর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও তাঁর পরিধেয় বস্ত্র নিয়ে যে ধরনের নিকৃষ্ট ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে, তা কেবল অমানবিকই নয়, বরং গোটা জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু এবং তাঁর পিতৃস্মৃতি বিজড়িত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতির পিতার স্মৃতি মুছে ফেলার এই হীন প্রচেষ্টা কার্যত বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাতের শামিল।
ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থানের দীর্ঘ ইতিহাস
শেখ হাসিনার জীবন মানেই মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে এগিয়ে চলা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ বার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে।
- ১৯৮১ সালের ১৭ মে: সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রিয় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন। সেদিন বিমানবন্দর পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে।
- বর্বর ২১ আগস্ট: ২০০৪ সালের সেই নারকীয় গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। চারপাশ লাশের স্তূপ হয়ে গেলেও ফিনিক্স পাখির মতো তিনি দমে যাননি।
- ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট: আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে করা নারকীয় তাণ্ডব থেকেও তিনি রক্ষা পান।
২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল শেখ হাসিনাকে ‘ফিনিক্স পাখি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা এক ফিনিক্স পাখি। বাবা-মা, ভাইসহ আপন আত্মীয়দের হারিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে তিনি তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছেন এই বাংলার আপামর মানুষের কল্যাণে।”
তার শাসনামলের ১৩ বছরে বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে, তা ছিল বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়
- অর্থনৈতিক বিপ্লব: মাথাপিছু আয় ৫৪৩ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ২,৮২৪ ডলারে।
- মেগা প্রকল্প: নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে তিনি বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
- ডিজিটাল বাংলাদেশ: ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পৌঁছে দিয়ে গ্রামকে শহরে রূপান্তর করেছেন তিনি।
শেখ হাসিনা কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি ছিলেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা মানবতার জননী। তাঁর সময়ে দেশের স্বাস্থ্যখাত ছিল মজবুত। শিশু মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে তিনি অর্জন করেছিলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। নিয়মিত ‘টিকাদান সপ্তাহ’ ছিল তাঁর শিশুদের প্রতি মমতার এক অনন্য উদাহরণ।
অথচ আজ চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমান প্রশাসনের উদাসীনতা ও ভুল নীতির কারণে দেশের টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়েছে। হাম ও বিভিন্ন উপসর্গে গত কয়েক সপ্তাহে ১৬৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টিকা ক্রয়ে বর্তমান প্রশাসনের অনীহা ও স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনার কারণে নিষ্পাপ শিশুরা আজ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে। জনমনে আজ একটাই প্রশ্ন—যে দেশে শেখ হাসিনা শিশুদের সুস্থ রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন, আজ সেখানে কেন এই লাশের মিছিল?
বর্তমানে শেখ হাসিনার ওপর হওয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অমানবিক আচরণ দেশের সাধারণ মানুষকে ব্যথিত করেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্যকে কখনও চাপা দিয়ে রাখা যায় না। ৩২ নম্বর বাড়ি ভেঙে বা হাজারো মিথ্যা মামলা দিয়ে শেখ হাসিনাকে জনগণের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর যে নাড়ির টান, সেই ভালোবাসার জোরেই তিনি আবারও ফিনিক্স পাখির মতো স্বমহিমায় ফিরে আসবেন এবং দেশবাসীকে এই দুঃসময় থেকে মুক্ত করবেন।
