নিজস্ব প্রতিনিধি
সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বাদ দিয়ে ব্যক্তিবন্দনা আর অবাস্তব দাবির এক নতুন নজির স্থাপন করেছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ১১তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর প্রয়াত ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ারও মুক্তিযোদ্ধার খেতাব দাবি করেছেন।
গাজীপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্যের এমন দাবিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘চরম চাটুকারিতা’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি’ হিসেবে দেখছেন।
সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তৃতায় দাবি করেন, ১৯৭১ সালে ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি থাকায় তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। তবে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধের সময় বন্দি থাকা আর সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা কি এক বিষয়? কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি মহান ও সংজ্ঞায়িত বিষয়কে এভাবে পারিবারিকীকরণের চেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননা কি না, সেই বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে ‘নির্যাতিত-নিপীড়িত বিপ্লবের নাম’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এই প্রস্তাব তিনি প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য করছেন না। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৩০ বছর পর আসন ফিরে পাওয়া এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করতেই তিনি সংসদকে এই ধরণের ‘আবেগী’ ও ‘ভিত্তিহীন’ দাবির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
মায়ের সাথে বন্দি থাকাকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার দাবিটিকে অনেক সংসদ সদস্য ও ইতিহাসবিদ হাস্যকর বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবারের প্রতি অতি-ভক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা। এর আগে বিভিন্ন শাসনামলে নিজেদের নেতাদের বড় করার জন্য ইতিহাসের যে বিকৃতি দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের সময়েও একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুজিবুর রহমান তাকে ‘পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি করেন। রাজনীতিতে প্রতিহিংসার অভিযোগ নতুন কিছু নয়, তবে সেই মৃত্যুকে পুঁজি করে এবং শৈশবের বন্দিদশাকে ‘যুদ্ধের ময়দান’ হিসেবে চিত্রায়িত করে রাষ্ট্রীয় খেতাব চাওয়াকে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির অপকৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদে যখন জনদুর্ভোগ, দ্রব্যমূল্য ও ইন্টারনেটের ধীরগতি নিয়ে আলোচনার প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের, ঠিক তখন এক সংসদ সদস্যের এমন ‘পরিবারকেন্দ্রিক’ ও ‘অবাস্তব’ দাবি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সমালোচকদের মতে, সংসদ এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী জায়গার চেয়ে ব্যক্তিগত তোষামোদির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
