বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক গভীর উদ্বেগের মেঘ দানা বাঁধছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের হৃদপিণ্ডে আঘাত হেনে সংসদে ও রাজনীতির উচ্চ পর্যায়ে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে উগ্রবাদী ও পাকিস্তানি ঘরানার রাজনৈতিক চিন্তাধারা। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংসদের বিরোধী দল এবং সরকারি দলের একটি অংশের কিছু সদস্যের বক্তব্য ও অবস্থানে এমন এক মৌলবাদী চিন্তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, যা সরাসরি জঙ্গি-মৌলবাদী গোষ্ঠীর এজেন্ডার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
সংসদের ভেতরে ও বাইরে এক ধরনের ‘পদ্ধতিগত বিদ্বেষ’ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সমাজের চিরায়ত বৈচিত্র্যকে ‘সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে কখনো হিন্দু, কখনো শিয়া, কখনো কাদিয়ানী বা আহলে কোরআন সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এমনকি আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ইসকন, মন্দির, মাজার এবং হাজার বছরের সুফি ও বাউল ঐতিহ্যকেও অপসংস্কৃতি হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা পাকিস্তানি দ্বিজাতি তত্ত্বের নব্য সংস্করণ বলে মনে করছেন সমাজচিন্তকরা।
এই প্রবণতা শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ, বেগম রোকেয়া কিংবা জাহানারা ইমামের মতো জাতীয় আইকনদের বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। পহেলা বৈশাখ, বসন্ত উৎসব, নাট্যোৎসব কিংবা ঘুড়ি উৎসবের মতো লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে ঘোরতর আপত্তি তোলা হচ্ছে। মুক্তচিন্তা, যুক্তি এবং ভিন্নমতকে দেখা হচ্ছে সন্দেহের চোখে। এমনকি আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতাকেও ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতি’ আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু, সংবিধান, শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং জাতীয় সঙ্গীতের মতো জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকগুলোকে তর্কের টেবিলে টেনে আনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সংসদের ভেতরে যখন পাকিস্তানি ধাঁচের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতিধ্বনি শোনা যায়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক মতভেদ থাকে না; বরং রাষ্ট্রের আদর্শগত কাঠামোর জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অসাম্প্রদায়িকতা ও বহুত্ববাদের পথে দেশকে ফিরিয়ে আনাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
