আগামী সপ্তাহে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নতুন চালান পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার এক প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই নেতিবাচক সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিতে পারছেন না, কারণ বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যবর্তী সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের প্রতিবন্ধকতার কারণে তেলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চালান সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
তবে এই সম্ভাব্য অচলাবস্থার ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা, কেননা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মূলত পরিশোধিত তেল আমদানি এবং অভ্যন্তরীণভাবে কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ এবং ডিজেল চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে, যার ফলে শোধনাগারটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও আমদানিকৃত পরিশোধিত তেলের প্রবাহ সচল থাকলে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
তবুও মধ্যমেয়াদে এটি আমদানির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সংকটের স্থায়িত্ব দীর্ঘ হলে দেশের মজুদ ও বিতরণ কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো প্রকট হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকেই যায়।
এই উদ্ভূত পরিস্থিতির নেপথ্যে কাজ করছে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধাবস্থা, যা সরাসরি স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। জ্বেলোনি বিভাগের তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে তেলবাহী জাহাজগুলো নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অগ্রসর হতে না পারায় অপরিশোধিত তেলের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
তবে সরবরাহ ব্যবস্থার এই প্রতিকূলতাকে আরও জটিল করে তুলছে জনমানসে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত ক্রয় প্রবণতা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বা সংকটের সংবাদ প্রচার হওয়ার পরপরই গ্রাহক ও ডিলার পর্যায়ে অস্বাভাবিক হারে জ্বালানি সংগ্রহের হিড়িক পড়েছে, যা বাজারে একটি কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বার্ষিক চাহিদা বৃদ্ধির হার সাধারণত ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছু ফিলিং স্টেশনে বিক্রির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মজুদদারি ও অতিরিক্ত কেনাকাটার ফলে ডিপিওগুলো থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও পাম্পগুলোতে দ্রুত তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে তেলের ঘাটতি নয় বরং বিতরণ ব্যবস্থাপনার ওপর একটি সাময়িক মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বর্তমান মজুদ ও আমদানি সূচি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজেলের চাহিদা মেটাতে সরকার ইতোমধ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। দেশে মাসিক প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন ডিজেলের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন মজুদ আছে এবং এপ্রিল মাসের জন্য আরও ১ লাখ ৭০ হাজার টনের আমদানি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতোমধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে এবং রাশিয়ার ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের আবেদন জানিয়ে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে পেট্রলের পুরো চাহিদা এবং অকটেনের ৪০ শতাংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। সম্প্রতি ২৫ হাজার টনের অকটেনের চালান দেশে পৌঁছানোয় এবং আরও সমপরিমাণ আমদানির অপেক্ষায় থাকায় আগামী দেড় মাসেরও বেশি সময় এই খাতে কোনো সংকটের সম্ভাবনা নেই।
পরিশেষে, ইস্টার্ন রিফাইনারি যদি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে, তবে তা ন্যাফতা উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপজাতের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা প্রকারান্তরে অকটেনের আমদানি নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলবে। তবে বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ইরানের পক্ষ থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে কর্মকর্তারা আশা করছেন যে, এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ অপরিশোধিত তেলের নতুন চালান দেশে পৌঁছাবে।
ততক্ষণ পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার গত বছরের চাহিদার অনুপাতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্ভাব্য সাময়িক বন্ধ হওয়া প্রযুক্তিগত বা আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সংকটের স্থানীয় প্রতিফলন; যা মোকাবিলায় সরকারের আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা এবং জনগনের ধৈর্যশীল আচরণই এখন প্রধান চাবিকাঠি।
